1. info@chattolarkantho.net : Chattolar kantho : Chattolar Kantho
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ১২:০৯ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম: :
আলীকদম প্রেসক্লাব নির্বাচন: সভাপতি এস,এম জিয়াউদ্দিন জুয়েল,সাধারণ সম্পাদক নুরখান‎ ফটিকছড়িতে সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এক নৈশপ্রহরী! ফটিকছড়িতে ১০ দিনে ৮৭ নবজাতকের জন্ম মিরপুরে চলন্ত মোটরসাইকেলে ইট মেরে ছিনতাই: মূল পরিকল্পনাকারী আটক পাকিস্তানের কাশ্মীরে আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির বিক্ষোভ-সংঘর্ষ, নিহত ১৫ সিডিএর নতুন চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন কাশ্মীরে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত পাকিস্তানের বহু সেনা নিহত বান্দরবান হাসপাতালের নির্মাণাধীন সার্ভিস সেন্টারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ২ শ্রমিক নিহত, আহত ১ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টাইগারদের ঐতিহাসিক সিরিজ জয় চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল! পাউবো’র উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে উঠেছে নানা গুরুতর অভিযোগ! এক ম্যাচে ৮ লাল কার্ড ও পরাজয় দেখলো ব্রাজিল অসহায়ের চোখের জল মুছছেন ‘মানবিক ডিসি’ জাহিদ বিশ্ব পরিবেশ দিবসে কোনাখালীতে বৃক্ষরোপণ, চারা বিতরণ ও সচেতনতামূলক র‍্যালি প্রশিক্ষণ শেষে চাকরি, ঝরে পড়াদের পাশে মানবিক ডিসি জাহিদ ২৭ বছর পর লিগ্যাল এইডের সহায়তায় পিতার পরিচয় পেলেন যুবক মাসব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি উদ্বোধন করলেন ডা. জুবাইদা রহমান বৃক্ষরোপণে ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকার প্রণোদনা আইসল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনার শুভ সূচনা সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে ৫০ শতাংশ মমতার বাড়িতে সিআইডি অভিযান ২১ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার পরাজয়, বাংলাদেশ পেল ৮৬ রানের জয় চমেক হাসপাতাল অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ হত্যা মামলায় ওয়েল গ্রুপের সিইও গ্রেপ্তার প্রথমবারের মত ১২ টি পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করল ভারত! সাধারণ জনগণের আস্থা সৃষ্টির মাধ্যমে জন-প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে: ডিসি জাহিদ চকরিয়ার দুই উপকূলীয় ইউনিয়নে ১ হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিল আইএসডিই বাংলাদেশ বিএসসি’র সাফল্য ও অগ্রগতির অন্যতম কারিগর মাহমুদুল মালেক কমরেড পূর্ণেন্দু কানুনগো’র নির্দেশনায় গেরিলা যুদ্ধে সক্রিয় অংশনেন বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহম্মেদ

পরাণ রহমান;মানবতার দীপশিখা ও সংগ্রামের আলোকবর্তিকা

চট্টলার কণ্ঠ ডেস্ক:
  • প্রকাশিত সময় : সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫

সৈয়দ মামুনূর রশীদঃ সমাজসেবায় নিবেদিতপ্রাণ এক মহিয়সী নারী শামসুন্নাহার রহমান পরাণ। একাধারে সংগঠক, মানবহিতৈষী, নারী উন্নয়নের পথিকৃৎ এবং এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। সমাজের অবহেলিত, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য নিরলস পরিশ্রম করেছেন তিনি। দুঃস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করেছেন, নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য লড়াই করেছেন এবং শিশুদের জন্য শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন।
১৯৪০ সালের ১লা জুন চট্টগ্রামের এনায়েত বাজারে জন্মগ্রহণ করেন পরাণ রহমান। তাঁর পৈত্রিক নিবাস ছিল কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে, ঐতিহ্যবাহী সুফি পরিবারে। শৈশব থেকেই সমাজের প্রতি গভীর আগ্রহ ও সহমর্মিতা ছিল তাঁর হৃদয়ে। মায়ের অনুপ্রেরণায় ছোটবেলা থেকেই দানশীলতা ও মানবসেবার চেতনা গড়ে উঠে তাঁর মধ্যে। মাত্র ষষ্ঠশ্রেণিতে পড়ার সময়ই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। স্বামী এম.এল. রহমান ছিলেন জমিদার পরিবারের সন্তান, কিন্তু এই আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য কখনো তাঁকে স্বার্থপর করে তুলতে পারেনি। তিনি বরং নিজের সবকিছু উৎসর্গ করেছিলেন মানুষের সেবায়। তিনি পরিবার ও সন্তান সামলিয়ে স্নাতক শেষ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে ভর্তি হন।
উন্নত সমাজ বিনির্মাণে নিজেকে দক্ষ উন্নয়ন কর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি অত্যন্ত দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছেন। এক নশ্বর জীবনের বিনিময়ে তিনি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন অসংখ্য মানুষের অকৃত্রিম, অবিনশ্বর ভালবাসা। উন্নয়ন সেক্টরে তিনি ভীষণ পরিচিত ছিলেন। চেনা-জানা সকলেরই প্রিয়মুখ এবং তাকে সবাই ‘পরাণ আপা‘ নামেই চিনতেন। তাঁর জীবনের ব্যাপ্তি: সমাজ, শিক্ষা, সংসার এবং উন্নয়ন সেক্টরে নক্ষত্র হয়ে উঠার গল্প ছিলো অত্যন্ত চমকপ্রদ এবং বিষ্ময়কর। তিনি ছিলেন একজন সমাজকর্মী, উন্নয়ন সংগঠক এবং নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ ও সফল যোদ্ধা। পরাণ রহমানের সামাজিক কর্মকান্ডের পরিসীমা এক কথায় বহুমাত্রিক। তাঁর জীবন-চরিত্র বর্ণনা করতে গেলে শেকসপিয়রের কথাটিই বেশী প্রাসঙ্গিক মনে হয়:
“Some are born great, some achieve greatness, and
some have greatness thrust upon them.”

পরাণ রহমান এই তিন গুণাবলীরই মেলবন্ধন ছিলেন। উন্নয়ন কর্মকান্ডের পাশাপাশি পরাণ রহমানের লাইব্রেরী প্রীতি ও লেখালেখি ছিল নেশার মতোই। বই না পড়ে উনি থাকতে পারতেন না। সমাজের অসঙ্গতি, অনিয়ম- যা দেখতেন তাই লিখতে চাইতেন। তিনি পত্রিকায় লেখালেখির পাশাপাশি সাতটি গ্রন্থ রচনা করেন, একাধিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তিনি বৃহত্তর চট্টগ্রামে এনজিওদের জন্য একটি রিসোর্স সেন্টার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন। প্রবীণদের কল্যাণে চট্টগ্রামে একটি বড়সড় এল্ডারলী ওয়েলফেয়ার সেন্টার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস তাঁর জীবনে এক গভীর পরিবর্তন নিয়ে আসে। ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত উপকূলীয় জনপদের অসহায় মানুষের দুর্দশা তাঁকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। গার্লস গাইড, তাঁর জৈষ্ঠ্যকন্যা পারভীন মাহমুদ এবং কন্যার সহপাঠিদের সংগঠিত করে তিনি ত্রাণসহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এ সময় তিনি অনুভব করেন, সাময়িক সহায়তা নয়, দরকার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নমূলক কাজ। তারপর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। তিনি সংগঠক হিসেবে যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। যুদ্ধ শেষে ১৯৭২ সালে নিজের মনের ভেতর গড়ে তোলা স্বপ্নের বীজ রোপণ করেন “ঘাসফুল” নামে এক উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে। নামের মতোই এই সংগঠন হয়ে ওঠে সংগ্রাম, লড়াই ও আশার প্রতীক।
যুদ্ধ বিধ্বস্থ দেশে দেশ পুর্নগঠনে শুরুতে তিনি রিলিফ-ওয়ার্ক এর মাধ্যমে উন্নয়নযাত্রা শুরু করেন। পরবর্তীতে পরিবার-পরিকল্পনা, নারীদের স্বাস্থ্যসেবা, সচেতনতা, দুস্থ শিশুদের শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি নিয়ে এগোতে থাকেন। ত্যাগ ও আন্তরিকতায় সমাজ উন্নয়নে সফলতায় ১৯৭৮ সালে ঘাসফুল জেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর থেকে চট্টগ্রামের প্রথম নিবন্ধিত এনজিও হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে এবং পরবর্তীতে সমাজসেবা অধিপ্তরে নিবন্ধিত হয় ১৯৮৩ সালে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে ক্রমশ বাড়তে থাকে ঘাসফুলের উন্নয়ন কার্যক্রমের বৈচিত্রতা। বর্তমানে ঘাসফুল দেশের আটটি জেলায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপদ কৃষি, ফলচাষ ও বাজার উন্নয়ন, লাইভস্টক, পরিবেশ, দুর্যোগ মোকাবেলা ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজন কার্যক্রম, সুশাসন ও ন্যায়বিচার, আইনী সহায়তা, অধিকার, নারী উন্নয়ন, কমিউনিটি উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরীকরণ, প্রশিক্ষণ ও কর্ম-সংস্থান সৃষ্টি, শিশু সুরক্ষা, কিশোর-কিশোরী উন্নয়ন, যুব উন্নয়ন, কারিগরী প্রশিক্ষণ, প্রবীণ কল্যাণ, কমিউনিটি উন্নয়নসহ পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠির অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। পরাণ রহমান সমন্বিত উন্নয়নে বিশ্বাস করতেন। তাঁর উন্নয়নের ক্ষেত্র ছিলো পরিবারের গর্ভবতী নারী থেকে শুরু করে প্রবীণ মানুষটির শেষযাত্রা পর্যন্ত। মূলমন্ত্র ছিলো; মানবজীবনের কোন স্তরই যেন সংস্থার সেবা থেকে বাদ পড়ে না যায়। তিনি সেবার পরিমাণগত নয় গুণগত উন্নয়নে বেশী গুরুত্ব দিতেন। এছাড়াও উন্নয়ন সেক্টরে তিনি এমন কিছু ইস্যু ও জনগোষ্ঠীর সমস্যা ও তার সফল সমাধান জনসম্মুখে নিয়ে আসেন, যা পূর্বে কারো নজরে আসেনি।

পরাণ রহমান আশি-নব্বইয়ের দশকেই সমাজের অচ্ছুত সম্প্রদায় (হরিজন), উপকুলীয় জেলে সম্প্রদায়, আদিবাসি, গার্মেন্টস কর্মী, গৃহকর্মী এবং বীরাঙ্গনাদের উন্নয়ন কর্মকান্ডের সূত্রপাত করেন, যা দিন দিন উন্নয়ন সেক্টরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠে। পরাণ রহমানের হাত দিয়েই এদেশে শুরু হয় আরবান মাইক্রোক্রেডিট। আশির দশকে তিনি শহরের বস্তি এলাকায় স্কুলিং কর্মসূচির পাশাপাশি সঞ্চয় ও দরিদ্র নারীদের আয়বর্ধনমূলক কার্যক্রমে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন, যদিও এ কার্যক্রম ছিলো বর্তমান মাইক্রোক্রেডিটের চেয়ে ভিন্ন ফরমেটের। অনেকেই জানেন না পরাণ রহমানের হাত ধরেই চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রগামী জেলেদের দক্ষতামূলক প্রশিক্ষণ, আধুনিক উপায়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা ও সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং তাদের পারিবারিক সচেতনতামূলক কর্মকান্ড শুরু হয়। তিনি কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণপাড়ে চরলক্ষা, ডাঙ্গারচর এলাকায় প্রান্তিক জেলেদের প্রশিক্ষণ, গভীর সমুদ্র থেকে নিয়ে আসা মাছের সংরক্ষণ, সূখি পরিবার গঠনে পরিকল্পনা, তাদের সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জেলে পরিবারের নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন সেই আশির দশকেই। তিনি চট্টগ্রামে প্রথম দারিদ্র্যপীড়িত শিশুদের জন্য “কমিউনিটি স্কুল” গড়ে তোলেন। বাংলাদেশের গার্মেন্টসশিল্পে নারী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে তিনিই সর্বপ্রথম সেলাই প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্যসেবামূলক কর্মসূচি শুরু করেন।

তিনি চট্টগ্রামের প্রায় শতাধিক দুস্থ নারীকে উন্নতমানের ধাত্রী প্রশিক্ষণ দিয়ে মহল্লায় মহল্লায় নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের কাজের বন্দোবস্ত করেন। এতে করে ওইসব দুস্থ নারী আয়রোজগারের পাশাপাশি নিজেদেরকে সমাজ উন্নয়নে সম্পৃক্ত করে সামাজিক মর্যাদা লাভ করেন। ধাত্রীদের ভালবেসে পরাণ রহমাণ ”তৃণমূলের রমণী” নামের একটি চমৎকার পুস্তিকাও রচনা করেন। পরাণ রহমান বিশ্বাস করতেন, উন্নয়ন হবে নিচুতলা থেকে, সমাজের অবহেলিত, পদদলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে। তাঁর কাজের মূলমন্ত্র ছিল, “মানুষের জন্য কাজ, মানুষের কল্যাণে কাজ। তিনি সবসময় বলতে চেয়েছেন-
“ঘাসফুল মাটিতে ফুটে, সূর্যের দিকে মুখ তুলে বাঁচে।
তেমনি আমরা চাই, মানুষকে মাটির কাছ থেকে তুলে
আলোর পথে নিয়ে যেতে।”

পরাণ রহমান শুধু সমাজসেবী নন, তিনি ছিলেন প্রকৃতির এক নিবেদিতপ্রাণ প্রেমিক। পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে তিনি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নেন এবং গ্রামাঞ্চলে দেশীয় ফলজ ও বনজ গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেন। কৃষকদের জন্য দেশীয় শস্যবীজ সংরক্ষণের উপর গুরুত্ব দেন, যাতে তারা টেকসই কৃষিকাজ চালিয়ে যেতে পারে। তাঁর চিন্তা-ভাবনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল “সবার জন্য সুস্থ, সুন্দর ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন।” তাঁর সেই স্মৃতিময় বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমটি ঘাসফুল এখনো নিজস্ব অর্থায়নে অব্যাহত রেখেছে। পরাণ রহমান দেশীয় বীজ বিলুপ্তিতে দারুণ উৎকন্ঠিত ছিলেন। তিনি নিজে বিভিন্ন শষ্যবীজ সংরক্ষণ করে মানুষকে বিলি করতেন। দেশীয় বীজ সংরক্ষণে গ্রামে-গঞ্জে চাষীদের উদ্বুদ্ধ করতেন। একবার তিনি দেশীয় বিপুল পরিমাণের দেশীয় খেজুর-চারা তৈরি করে চট্টগ্রামের ডিসি হিলের চারপাশে লাগিয়ে দেন। পরাণ রহমান সবসময় বলতেন: “মানুষের জন্য কাজ, মানুষের কল্যাণে কাজ।” “মানবসেবা যে কতটা বড় ধর্ম, তা বোঝা যায় কিছু মানুষের জীবন দেখলে। পরাণ রহমান এমনই একজন মানুষ ছিলেন। “সমাজ নিয়ে তাঁর স্বপ্ন ছিলো এমনই;
“আমার স্বপ্ন, প্রতিটি শিশু শিক্ষার আলো পাক।
প্রতিটি নারী আত্মমর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে শিখুক।
প্রতিটি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কেউ থাকুক।”

১৯৯৬ সালে তিনি দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। চিকিৎসকরা তাঁকে মাত্র পাঁচ বছরের আয়ু দেন, কিন্তু তিনি আরও উনিশ বছর লড়াই করেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে গেছেন। কেমোথেরাপির মাঝেও তিনি অফিসে এসে কাজ করতেন, নতুন প্রকল্প নিয়ে ভাবতেন, কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতেন। তিনি বলতেন, “মানবসেবা আমার ক্যান্সার রোগের পথ্য।” আরেো বলতেন, “নিজের বেদনা ভুলতে হলে, অন্যের বেদনায় সামিল হও।” যতই কষ্ট হোক, তিনি ঘাসফুল অফিসে গিয়ে কাজ করতেন, মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় শামিল হতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, “আমি চাই আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত হোক অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য।” বস্তুত তিনি আমৃত্যু তাই করে গেছেন। জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত কাজে লাগিয়েছেন মানুষের কল্যাণে। তিনি শিক্ষকতা দিয়ে জীবন শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে ঘাসফুলের উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর প্রতিষ্ঠিত ঘাসফুল এডুকেয়ার কেজি স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জীবদ্দশায় তিনি বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে, স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন।

পরাণ রহমান বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর প্রতিটি কাজ, প্রতিটি উদ্যোগ ছিল সমাজের প্রান্তিক, অবহেলিত মানুষের ক্ষমতায়নের জন্য। তিনি একজন সফল উন্নয়ন সংগঠক ছিলেন না, তিনি পারিবারিক জীবনেও অত্যন্ত আন্তরিক এবয় প্রিয়মুখ ছিলেন। পরিবারের সবাইকে দেখেশুনে রাখতে ভালবাসতেন। পারিবারিক যে কোন আয়োজনে, পার্বনে, অনুষ্টানে তিনি সকলকে একজায়গায় নিয়ে আসতেন। আত্ময়ি-স্বজনের বিপদ-আপদে ছুটে যেতেন। বাবার বাড়ি কিংবা স্বামীর বাড়ির দরিদ্র প্রতিবেশীদের খোঁজ-খবর নিতেন, তাদের প্রতি সহায়তার হাত সর্বদাই বাড়িয়ে রাখতেন। তিনি বলতেন, “যে মানুষ অন্ধকারে চেয়ে থাকে, তার চোখে আলো দেখানোই মানবতা।

২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সুবেহ-সাদেকের পবিত্র মুহুর্তে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ও কর্ম আজও বেঁচে আছে। তাঁর হাতে গড়া “ঘাসফুল” আজও হাজারো মানুষের জীবন পরিবর্তন করছে। সমাজের দরিদ্র, অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য তিনি যে কর্মযজ্ঞ রেখে গেছেন, তা আজও অনুপ্রেরণা হয়ে আছে অসংখ্য সমাজসেবকের জন্য।
“তোমার পথ ধরে হাঁটছে শত শত স্বপ্নবাজ,
তোমার আলো ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর বুকে।
তোমার কর্মই তোমাকে অমর করেছে—
মানুষের হৃদয়ে, ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায়!”

পরাণ রহমান বলেছিলেন, “মানুষের জন্য বাঁচা, মানুষের জন্য কাজ করা—এটাই আমার জীবন দর্শন।” এই দর্শন আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে, প্রতিটি উন্নয়নকর্মীর পথপ্রদর্শক হয়ে আছে। ঘাসফুল পরিবার পরাণ রহমানের ১০ম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাঁকে স্মরণ করছে এবং তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছে। তাঁর স্বপ্ন ও কর্ম আমাদের পথচলার অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে চিরকাল।

  • লেখকঃ সৈয়দ মামুনূর রশীদ। (উন্নয়নকর্মী)

পোস্টটি শেয়ার করুন:

আপনার মতামত দিন

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য সংবাদ

সম্পাদকীয় কার্যালয়: ৩২১ দিদার মার্কেট( চতুর্থ তলা) নবাব সিরাজউদদৌলা রোড, কোতোয়ালি, চট্টগ্রাম। যোগাযোগ: +৮৮০১৭১৭-৯৯১৩৯৮। ইমেইল: weeklychattolarkantho.com@gmail.com