চট্টগ্রাম ব্যুরো:দীর্ঘ ২৭ বছরের অবহেলা, পিতৃপরিচয়হীনতার গ্লানি আর আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটলো অবশেষে। জেলা লিগ্যাল এইড অফিস চট্টগ্রামের মানবিক ও আইনি হস্তক্ষেপে অবশেষে নিজের জন্মদাতা পিতার পরিচয় ফিরে পেয়েছেন এক যুবক। ডিএনএ টেস্টের রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি ওই ব্যক্তিরই নিশ্চিত জৈবিক সন্তান।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার কার্যালয়ের অফিস সহকারী এরশাদ উল্লাহ।
বিচ্ছেদ ও পরিচয়হীনতার দীর্ঘ ইতিহাস
জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সিভিল জজ) সুব্রত দাশ জানায়, আজ থেকে দীর্ঘ ২৭ বছর পূর্বে যখন ওই যুবকের জন্ম হয়, তখন তার পিতা প্রবাসে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে পারিবারিক কলহের জেরে তার পিতা-মাতার মধ্যে স্থায়ী বিবাহবিচ্ছেদ কার্যকর হয়। বিচ্ছেদের পর মাতা অন্যত্র বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে আক্ষরিক অর্থেই পৈত্রিক স্নেহ ও পরিচয় থেকে বঞ্চিত হয়ে এক প্রকার এতিম হয়ে পড়েন এই সন্তান। এরপর থেকে মামার আশ্রয়েই বড় হতে থাকেন তিনি।
ডিএনএ টেস্ট ও আইনি লড়াই:
নিজের ন্যায্য অধিকার ও পিতৃপরিচয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০২৪ সালে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস চট্টগ্রামে প্রথম একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন ওই যুবক। অভিযোগের প্রেক্ষিতে উভয় পক্ষকে ডাকা হলে, পিতা শর্ত দেন যে—ডিএনএ টেস্টের পজিটিভ রিপোর্ট ছাড়া তিনি কোনোভাবেই তাকে সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দেবেন না। পিতৃত্ব প্রমাণের এই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এগিয়ে আসে চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড কর্তৃপক্ষ। ২০২৬ সালে এসে লিগ্যাল এইড অফিসের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও ২ জন প্যানেল আইনজীবীর নিরলস আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে মা, বাবা ও সন্তানের ডিএনএ টেস্টের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে মঙ্গলবার সেই বহু প্রতীক্ষিত মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডিএনএ টেস্টের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জেলা লিগ্যাল এইড অফিস চট্টগ্রামে হস্তান্তর করে। রিপোর্টে বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত হয় যে, ওই যুবকই তার পিতার প্রকৃত ও বৈধ সন্তান (৯৯.৯৯% জৈবিক মিল)।
ডিএনএ রিপোর্টের সত্যতা প্রকাশের পর পিতা তার ভুল স্বীকার করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে সন্তানকে বুকে টেনে নেন। আপস-মীমাংসার শর্তানুযায়ী মঙ্গলবার থেকেই পুত্র তার পিতার নিজ বাসভবনের নিচতলার কক্ষে বসবাস শুরু করবেন বলে জানা গেছে।
জানা যায়, আগামী শুক্রবার জুমার নামাজের পর স্থানীয় মসজিদে এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের সন্তান হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেবেন পিতা। একইসাথে সন্তানের যাবতীয় বৈধ উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির অধিকার বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
জেলা লিগ্যাল এইডের সহকারী মোহাম্মদ এরশাদুল ইসলাম জানান, এই সফল ও মানবিক মীমাংসার পর জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের পক্ষ থেকে পিতা ও পুত্র উভয়কে শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে টি-শার্ট প্রদান করা হয়। সরকারি আইনি সহায়তা কেন্দ্রের এই আন্তরিকতায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তারা। “বিনামূল্যে সরকারি আইনি সহায়তার মাধ্যমে একটি পরিবারের পুনর্মিলন এবং একজন যুবকের দীর্ঘ ২৭ বছরের পিতৃপরিচয় ফিরিয়ে দিতে পারা আমাদের আইনি সেবার অন্যতম বড় সার্থকতা।”
আপনার মতামত দিন