বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন সক্রিয় সংগঠক, সুবক্তা ও প্রখ্যাত কলামিস্ট। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনীর অধীনে এবং কমরেড পূর্ণেন্দু কানুনগো’র নির্দেশে ভারতে ট্রেনিং নিয়ে সরাসরি গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিয়ে রণাঙ্গনে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফজল আহমদ তাঁর সাহসী নেতৃত্ব এবং প্রগতিশীল আদর্শের জন্য সমাজে বিশেষভাবে সম্মানিত।
তিনি ১৯৬৭ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে ছাত্র ইউনিয়ন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর (এম.এ.) ডিগ্রি অর্জন করেন। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরও তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত আছেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধা সংসদ (প্রাতিষ্ঠানিক কমান্ড, চট্টগ্রাম)-এর কমান্ডার, চট্টগ্রাম প্রাতিষ্ঠানিক বীর মুক্তিযোদ্ধা সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি এবং বঙ্গবন্ধু সমাজ কল্যাণ পরিষদ চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।এছাড়া তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত আছেন।
বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমদ স্থানীয় গৈড়লা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ করেন। গৈড়লা কে.পি. উচ্চ বিদ্যালয় হতে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৭২ সালে পটিয়া কলেজ উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন ৭৪’ সালে এইচ.এস.সি. পাশ করেন। এইচ.এস.সি. পাশের পর পটিয়া কলেজেই ডিগ্রীতে ভর্তি হন। ১৯৭৭ সালে ডিগ্রী পাশ করেন। ১৯৭৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ (রাষ্ট্র বিজ্ঞানে) ভর্তি হন ১৯৮০ সালে এম.এ পাশ করেন। এম.এ পাশ করেই তিনি চট্টগ্রাম আইন কলেজে ভর্তি হন এবং আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। আইন কলেজে পড়াশোনা শেষ করেই অন্য কোন পেশায় না গিয়ে তিনি চাকুরী করার সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৮৭ সালে ৬ মার্চ শুক্রবার। বোয়ালখালী ঘোষখীল গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবার বাংলাদেশ ডাক বিভাগের কর্মকর্তা আবদুল লতিফ মহোদয়ের ১ম কন্যা জেসমিন আরা বেগমকে বিবাহ করেন। জেসমিন আরা বেগম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইসলামের ইতিহাস বিভাগে এম.এস পাশ করেন এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সহকারী জেনারেল ম্যানেজার।
বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমদ ৪ (চার) গর্বিত কন্যা সন্তানের জনক।
১ম সন্তান প্রকৌশলী সাবরিনা বিনতে আহমদ সাকী একজন আই.টি বিশেষজ্ঞ। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানে আইটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে চাকরিতে আছে। তিনি ঢাকা বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় ও ভার্জিনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়াশোনা করেন। ২য় সন্তান ডাক্তার সায়মুনা জেসমিন পিংকি, এম.বিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), চট্টগ্রাম পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ কর্মরত আছেন। ৩য় সন্তান প্রকৌশলী ইফফাত বিনতে ফজল (ইমু) আমেরিকান মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি হতে কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার এম.এস করে ১ম শ্রেণিতে ১ম হয়েছে এবং বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে কর্মরত আছেন। ৪র্থ সন্তান ফারিয়া জেসমিন প্রিমা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজম্যান্টে এমবিএ করছেন।
বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমেদ কমরেড পূর্ণেন্দু কানুনগোর নির্দেশে ও প্রেরণায় ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়ন-কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত গেরিলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে ভারতে ট্রেনিং গ্রহণ করেন। তিনি চট্টগ্রামের পটিয়া এলাকার ছাত্রনেতা ছিলেন এবং পরবর্তীতে ভারতীয় সীমান্তে ট্রেনিং সম্পন্ন করে দেশে প্রবেশ করে সরাসরি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।
ভারতের মাটিতে ট্রেনিংয়ের জন্য গমনের পূর্বে কমরেড পূর্ণেন্দু কানুনগো, কমরেড আবদুস সাত্তার এবং ক্যাপ্টেন দাশ ভারতীয় সীমান্তে তাঁদের বিদায় ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
পটিয়ার কালারপোল এবং পশ্চিম পটিয়া অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ছাত্র সংগ্রাম ও গেরিলা যুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহম্মেদের মতো সাহসী যোদ্ধাদের অবদানেই ১৯৭১ সালে পটিয়াসহ সমগ্র চট্টগ্রাম অঞ্চলে শত্রুমুক্ত করার পথ সুগম হয়েছিল।
তিনি কেবল যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেননি। তিনি আজও যুদ্ধ করে যাচ্ছেন সমাজের মানুষের জন্য এবং দেশের কল্যানে কাজ করার মাধ্যমে। তিনি ক্রমগত মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের আদর্শ ধারণ করে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত থেকে সমাজে ন্যায়বিচার ও দেশপ্রেমের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
তিনি সমাজ, ইতিহাস ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে কলাম লেখেন।আজীবন মানবকল্যাণ ও সমাজসেবামূলক কাজে জড়িত থেকে তিনি নতুন প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
তিনি কর্মজীবনে চট্টগ্রাম বন্দর, চট্টগ্রাম কাস্টম পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দান করে যুগ্ম পরিচালক পদ থেকে ২০১৪ সালে অবসরে যান। সরকারের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন কালে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন দেশের কল্যানে কাজ করতে। কর্মনিষ্ঠা ও সেবাই একজন বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমদ অনেকের জন্য আর্দশ বটে। বিভিন্ন আন্দোলন, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এর সাথে ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িত আছেন।
কমরেড পূর্ণেন্দু কানুনগো (১৯১৭ – ১৯৯৫) ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সাহসী যোদ্ধা এবং বাংলাদেশের একজন প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক। আমৃত্যু মেহনতি মানুষের মুক্তির জন্য নিবেদিত এই বিপ্লবী চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কেলিশহরে জন্মগ্রহণ করেন।
১৯৩৯ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে তিনি ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়সহ বিভিন্ন সময়ে তিনি চট্টগ্রাম, ঢাকা ও যশোর জেলে দীর্ঘ কারাবরণ করেন। জেলে বন্দি থাকা অবস্থায়ই তাঁর সাথে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিচয় ঘটে।
জনতার চাপে ১৯৫৭ সালে তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন বোর্ডের নির্বাচনে প্রার্থী হন এবং বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। এরপর দীর্ঘ সময় তাঁর মনোনীত প্রার্থীরাই ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতেন।
১৯৮০ সালে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৭ সালে কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল কমিশনের সদস্য হন। এছাড়া তিনি ১৯৮১ সালে সোভিয়েত সরকারের আমন্ত্রণে দীর্ঘকাল সোভিয়েত সমাজ ও কৃষি ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।
তৃতীয়বার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৯৫ সালের ৭ জুন এই মহান নেতা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
কমরেড পূর্ণেন্দু কানুনগো ছিলেন একাধারে আন্দোলনকারী ও সংগঠক। আজকের প্রজন্মের বহুনেতা ও কর্মী তাঁর হাতের সৃষ্টি। তিনি নিজেকে কখনো অতি পবিত্র, অপরিবর্তনীয় বা অভ্রান্ত মনে করতেন না। সিদ্ধান্ত প্রদানের পূর্বে বারে বারে কর্মীদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। নেতৃত্বের এসব গুণাবলিতে কমরেড পূর্ণেন্দু কানুনগো ছিলেন এক বিরল দৃষ্টান্ত। সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহের আপাতঃ বিপর্যয়ে তিনি কখনো হতাশ বা বিভ্রান্ত হননি।
আপনার মতামত দিন