প্রকৃতির নিয়মেই মানুষ মাতৃগর্ভ থেকে এ ধরাধামে জন্মগ্রহণ লাভ করে। এ বসুন্ধরা ভগবানের সৃষ্টি ও তারই নিয়ন্ত্রনাধীন, শিশু থেকে কিশোর, কিশোর থেকে যৌবন, এভাবে ধাপে ধাপে মানুষ বেড়ে ওঠে, মানুষের বেঁচে থাকা ও জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত উপকরণ – খাদ্য, ফুল-ফল, শস্য কন্যা, আলো, বাতাস, জল, সবকিছুই ভগবানের দান। এ উপকরণগুলো মানুষের জন্য অপরিহার্য, এগুলো গ্রহণ করেই মানুষ নিজের প্রাণটা জীবিত রাখে। ভগবান এতই করুণাময়, দয়াময় মানুষ পৃথিবীতে আসার আগেই মানুষের বাঁচার উপকরণগুলো সঞ্চিত করে রাখে।
আমরা যখন মাতৃগর্ভে অবস্থান করি, ঐ সময় থেকেই মাতৃস্তন্যে ‘সাদা ভিটামিন’ নামে খ্যাত জীবন রক্ষাকারী দুগ্ধ সঞ্চিত অবস্থায় থাকে যাতে জীবন প্রবাহ অব্যাহত থাকে। দিন, মাস – বছর পেরিয়ে আমাদের জীবন এগোতে থাকে, কিশোর, যৌবন অতিক্রম করে বৃদ্ধাবস্থায় পতিত হয়ে শেষে পারলৌকিক মৃত্যুকে আলিংগন করে জীবনাবসান হয়। এরই মধ্যে নিজ কর্মগুণে কেউ কেউ মানুষের মধ্যে চিরদিন অমর হয়ে থাকেন আর অনেকেই হারিয়ে যান কালের পরিক্রমায়।
এমনই একজন কালোত্তীর্ণ যোগসাধক, মহাযোগী ব্রক্ষ্পুরুষ, যোগাকাশের দেদীপ্যমান নক্ষত্র, কঠোর যোগ মার্গের সাধনায় সিদ্ধ পুরুষোত্তম, ব্রহ্মলীন ও মহাপুরুষ শ্রী মন্মহর্ষি সত্যানন্দ যতি মহারাজজী। এই জ্যোতির্ময় অমৃত পুরুষের শ্রী চরণে ভূয়ঃ ভূয়ঃপ্রণাম নিবেদন করছি।
আবির্ভাব: উত্তর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার স্রোতস্বিনী হালদা নদীর তীরে সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা নিবিড় পল্লী অঞ্চল প্রখ্যাত সুয়াবিল গ্রাম। ঐ গ্রামেরই ধর্মঅনুরাগী, ধর্মপ্রান, বৈশ্য কুলোদ্ভব, গুরুগতপ্রাণ, ভগবান সেন ও গুরুদাস পূজারী ভক্তিময়ী, জ্ঞানময়ী, ধর্মপরায়ণা মাতৃদেবী প্রভা সেনের কোলে ১৩৬১ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণপক্ষের দ্বিতীয়া তিথি ১৯৫৪ খ্রীষ্টাব্দের ৭ই জুন এক দেবশিশুর আবির্ভূত হয়েছিল। দিনটি ছিল খুবই পূণ্যময় দিন। ঐদিন সুয়াবিল গ্রামে ও নিবিড় শ্যামল পাড়ায় আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া ও সাড়া পড়েছিল। এক ভবিষ্যৎ মহাপুরুষের আগমনী বার্তা ধ্বনিত হয়েছিল সকল আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার হৃদয়ে। চারিদিকের পরিবেশ ছিল পরমানন্দ মুখর।
বাল্য ও শিক্ষাজীবন: ফটিকছড়ি থানার বখতপুর গ্রামে ভক্তপ্রবর, ধর্মপরায়ন গোপাল ধরের বাড়ীতে বাল্যজীবন অতিবাহিত করেন। শ্রদ্ধেয় গোপাল ধর সম্পর্কে মামা ছিলেন। মামার বাড়ীতে মামী ননী বালা ধরের মাতৃসুলভ পরিচর্যায়, আদর, স্নেহে,লালন-পালনে শৈশব জীবন অতিবাহিত হয়। বখতপুর গ্রামের আনন্দময়ী কমলকৃষ্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনে নিজ পিত্রালয়ে ফিরে আসেন। বারমাসিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন। ছাত্রাবস্থাতেই ধীর-স্থির-শান্ত বিচরণ করতেন, যুবক বয়সের চপলতা, চঞ্চলতা, অসংযত কথাবার্তা, বাচালতা, অযথা উন্মাদনা কিছুই ছিল না বরং সত্য, সরলতা, ধীরতা, স্থির মনোভাব পরিলক্ষিত হত সর্বদাই। অন্য দশজন সহপাঠীর মতো হৈ হুল্লোড়, অপ্রাসঙ্গিক বচন, অশালীন আচরণ, বয়োজ্যেষ্ঠদের অশ্রদ্ধা সবই বর্জিত ছিল প্রাত্যহিক জীবন-যাপনে। এক কথায়, সাত্ত্বিকসুলভ আধ্যাত্মিক ভাবযুক্ত আচরণ দৃশ্যমান ছিল সর্বদাই। পর্যায়ক্রমে নাজিরহাট ডিগ্রী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও জাহানারা ডিগ্রী কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী তথা গ্র্যাজুয়েট সম্পন্ন করেন।
ব্যবহারিক জীবন ও সাধুসঙ্গ:— সত্যানন্দ যতি মহারাজজীর পূর্বাশ্রম ছিল নিজ আশ্রমের অতীব নিকটে। পিতা ভগবান সেন গুরুদাস বাবার একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন, আশ্রমে যাওয়া-আসা করতেন। তখন আশ্রমে আচার্যরূপে অধিষ্ঠিত ছিলেন যোগানিষ্ঠ সাধক শ্রীমৎ স্বামী সুর-সচ্চিদানন্দ প্রকাশ হেম সাধু। পিতা ভগবান সেন পুত্র সত্যানন্দ যতি মহারাজকে (গৃহী নাম বাবুল সেন) সাথে নিয়ে যেতেন। হেম সাধু বাবুল সেনকে খুবই আদর করতেন এবং বলতেন এ শিশু গুরুদাস বাবার দান, এ ছেলেকে আশ্রমে সমর্পণ করুন। এ সবই ঐশী লীলা, অর্থাৎ তিনি যে অনিত্য সংসারের মায়া-মোহে আবদ্ধ হবেন না, আত্মজ্ঞান তথা মোক্ষলাভের জন্য জীবন উৎসর্গিত করবেন , এটাই পরমেশ্বেরর অদৃশ্য ইশারা। বিত্ত-বিষয়-বৈভব-কামিনী-কাঞ্চন থেকে দূরে থেকে জ্যোতিময় পরম পুরুষেব নৈকট্য লাভে ধাবিত হবেন, জীবন হবে আলোকময় ও পরমাজ্জ্বল। ছাত্র জীবন ও যুবক বয়সে ব্যবহারিক জীবন নিজেকে আবদ্ধ না রেখে আশ্রম ও আশ্রম সংক্রান্ত কাজে সময় অতিবাহিত করতেন বেশী। এভাবে গুরুদাস বাবার প্রভাবে ও হেম সাধুর প্রেরণায় ব্রহ্মচর্য জীবনে অবগাহন করলেন সত্যানন্দ যতি মহারাজ। পরম পুরুষ, মহান যোগসাধক ত্রিকালজ্ঞ গুরুদাস পরমহংসদেবের আশ্রয়েই স্থিত হলেন সত্যানন্দ মহারাজ।
ব্রহ্মচর্য জীবন: পিতা ভগবান সেনের গৃহ ত্যাগ করে সিদ্ধাশ্রমে স্থায়ী আবাস নিলেন, আশ্রমের নিত্যদিনের কাজ সম্পাদন করতেন, ব্রাহ্মমুহূর্তে শয্যা ত্যাগ করে ব্রাহ্মকালীন প্রার্থনায় যোগ দিতেন, প্রার্থনা-উপাসনা সমাপনান্তে আশ্রম অঙ্গন পরিচর্যা, পরিষ্কার, স্নান-শৌচাদি সেরে গুরুদাস বাবার, মুনিবাবার মন্দির পরিচর্যা করত: আশ্রমস্হিত বাগান থেকে পূজার নিমিত্তে পুষ্পচয়ন, পূজার সরই মার্জন, পূজার নৈবেদ্য প্রস্তুতকরণ, গর্ভ মন্দির মার্জিত করণ, নিত্যপূজার উপকরণ সাজানো সবই করতেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সহিত। আহার সংযম, দৈহিক সংযম, যোগ ক্রিয়া অনুশীলন, শ্রীমদ্ভাগবত গীতা পাঠ, ত্রিসন্ধ্যা, গুরুদেবের নিমিত্তে ভোগ রন্ধন ও ভোজন সবই সম্পন্ন করতেন অত্যন্ত নির্লোভ ও বিরক্তিহীনতার সহিত।
এক পর্যায়ে হেম সাধুর নিকট দীক্ষা প্রার্থী হলেন, কিন্তু হেমসাধু দীক্ষা যজ্ঞে প্রবৃত্ত না করে উপদেশ দিলেন – গুরুদাস বাবার চরণ ধরে থাক, আশ্রমের সেবায়েতরূপে থাক, এখনও দীক্ষা নেবার সময় হয়নি, সময় হলে গুরু দর্শন হবে। কালক্রমে হেম সাধু ব্রহ্মলীন হলে শ্রীমদ্ স্বামী সুতেজানন্দ যতি মহারাজের সকাশে আসেন সত্যানন্দ ব্রহ্মচারী। সুতেজানন্দ যতি মহারাজ প্রগাঢ় ব্রহ্মজ্ঞানী জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ। ব্রহ্ম জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, শ্রী মন্মহর্ষি হরিকৃপানন্দ স্বামী (মুনিবাবার) প্রধানতম শিষ্য ছিলেন তিনি। সাধন জগতে সুতেজানন্দ ঠাকুর এক বিরল ও অন্যতম যোগী পুরুষ ছিলেন, গুরুদাস পরম্পরার অষ্টাঙ্গ যোগ সাধনার এক অনন্য কীর্তিমান উজ্জ্বল্যমান মহাপুরুষ। তিনি যোগ সাধনার অত্যন্ত সুকঠিন পথ পাড়ি দিয়েই উচ্চ মার্গের সাধনস্তরের কালজয়ী সন্ন্যাসী ছিলেন, উনার সাধন প্রতিভা সম-সাময়িক অন্যান্য যোগ পুরুষদের জন্য অনুকরণীয় ছিল। উনার সকাশে ও তত্ত্বাবধানে সত্যানন্দ ব্রহ্মচারীর ব্রহ্মচর্য জীবন পরিচালিত ও প্রসারিত হতে থাকে, সুতেজানন্দ যতি মহারাজের নির্দেশমতে, দেখানো পথে ও সমন্বয়ে নিজেকে কঠিন আত্ম সাধনায় নিমগ্ন রাখতেন সত্যানন্দ ব্রহ্মচারী। সত্যানন্দের আত্মিক আচার-আচরণ সাধনার একাগ্রতা দেখে গুরু পরায়ণ ভাব পর্যবেক্ষণ করে শুভদিনে শ্রীমদ্ স্বামী সুতেজানন্দ যতি মহারাজ সত্যানন্দ ব্রহ্মচারীকে দীক্ষা যজ্ঞে যজ্ঞায়িত করেন। কালক্রমে অষ্টাঙ্গ যোগ সাধনার ধাপ জপ, ধ্যান, নিয়ম-আসন-প্রত্যাহার পর্বসমূহ অত্যন্ত মনোযোগ ও একাগ্রতায় সম্পন্ন হলে সুতেজানন্দ যতি মহারাজ সত্যানন্দ ব্রহ্মচারীর উপর প্রসন্ন হন। পর্যায়ক্রমে সুতেজানন্দ যতি মহারাজের আদেশক্রমে ব্রহ্মচর্য পালন অন্তে উনার প্রসন্নতায় গৈরিক বসন দান করেন। তিন বৎসর অহোরাত্র মৌনব্রতপালন করেন সত্যানন্দ ব্রহ্মচারী। অতঃপর সিদ্ধাশ্রম অঙ্গনে উৎসব অনুষ্ঠানে সুতেজানন্দ যতি মহারাজ ও কলকাতার আদ্যাপীঠের প্রবীণ ও প্রখ্যাত সাধক ব্রহ্মচারী মুরাল ভাই এর অংশগ্রহণে সত্যানন্দ মহারাজ মৌনব্রত যজ্ঞের পূর্ণাহুতি প্রদান করেন, এবং সুতেজানন্দ যতি মহারাজের অনুমতিক্রমে সুয়াবিল সিদ্ধাশ্রমের দায়িত্বভার গ্রহন করেন।
সিদ্ধাশ্রমের রূপকার: ঐ সময় আশ্রম অঙ্গন ছিল জীর্ণ-শীর্ণ ভাঙা-বেড়ার কুটির, আশ্রমে সঠিক পরিকাঠামো ছিল না, সত্যানন্দ যতি মহারাজের বহুবিধ উদ্যোগের ফলে এবং কায়িক পরিশ্রম ও আশ্রমের সহিত যুক্ত ভক্তবৃন্দের ও শুভানুধ্যায়ীদের একান্তিক প্রচেষ্টায় সার্বিক,আর্থিক সহযোগিতায় ধীরে ধীরে আশ্রমের শোভা বর্ধিত হয় এবং ক্রমশ আশ্রমের মনোহর সৌন্দর্য্য-মাধুর্য্যে ভরপুর হয়ে উঠে। সিদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা ও মহাশক্তিধর যোগীপুরুষ শ্রীমৎ স্বামী গুরুদাস পরমহংসদেব, উনার সাধন প্রতিভা খুবই বিরল ও অনন্য।
কালক্রমে সত্যানন্দ যতি মহারাজের সাধন মহিমা ও আশ্রমে উনার কর্ম-তৎপরতায় ভক্ত অনুরাগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে ও আশ্রমের সুনাম চারিদিকে বিস্তৃত হতে থাকে, আশ্রম অঙ্গন নবরূপে স্থাবর জঙ্গম তীর্থে পরিণত ও বিস্তৃত হয়, নিজস্ব আঙ্গিনা ছাড়িয়ে আরো ব্যাপক আকারে সিদ্ধাশ্রমের বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে। গুরুদাস পরমহংসদেবের আধ্যাত্মিক মহিমা ও সাধন বিভূতি কিভাবে সর্বসাধারনের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, সে বিষয়ে নিরন্তর প্রচেষ্টা ও যথাযথ পদক্ষেপ নিলেন সত্যানন্দ যতি মহারাজ।
ভক্তবৎসল সত্যানন্দ যতি মহারাজ: আশ্রমে আগত সকল ভক্তবৃন্দকে সমাদর করতেন সত্যানন্দ যতি মহারাজ। প্রসাদ না নিয়ে কোন ভক্ত ফিরতে পারতোনা এবং প্রসাদ গ্রহনের জন্য প্রনামী ধার্য ছিলনা, সবাই প্রসাদ পেতো যথানিয়মে। ত্রিসন্ধ্যা, উপাসনা, প্রার্থনা, সংযম সাধন, একাদশী পালন, অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে নিশি পালন ও মুরগীর ডিম- মাংস বর্জনে উদ্বুদ্ধ করতেন শরনাগত ভক্তদের। মানুষের জীবনের সংবিধান এবং সর্ব শাস্ত্রের সার শ্রীমদ্ভাগবদগীতা পাঠে উৎসাহিত করতেন এবং গীতায় উক্ত বিধান অনুযায়ী সবাইকে জীবন যাপন করতে বলতেন, তাতেই পরম সুখের আস্বাদনে অনুপ্রাণিত করতেন ভক্তদের।
আশ্রমে আগত শিষ্য-ভক্তদের বলতেন — মনুষ্য জীবন অতীব দুর্লভ, তাই মনুষ্য জীবন লাভ করে ত্রিসন্ধ্যা, বন্দনা, প্রার্থনা, জপ ধ্যান করুন, তাতেই ভগবানের আশীর্বাদ প্রাপ্ত হবেন। যে আশীষে ইহলোকে শান্তি ও পরলোকে সদ্গতি প্রাপ্ত হবেন। ভক্তবৃন্দের এভাবেই ধর্ম পরায়ন তথা ধর্ম পালনে উৎসাহিত করতেন। ভক্তরা এমন অমৃত সুধা শ্রবনে কৃতার্থ হতেন, আশ্রমে বিশেষ দিন ছাড়াও প্রচুর ভক্ত ও আশ্রম সুহৃদরা সমবেত হতেন।
গীতাগত প্রান সত্যানন্দ বাবাজী: শ্রী মদ্ভাগবদগীতাকেই সর্বশাস্ত্রের সার মানতেন সত্যানন্দ বাবাজী। আগত ভক্তদের সাংসারিক কোন সমস্যা বা ধর্মাচরন বিষয়ক কোন প্রশ্নের উত্তরে গীতায় উক্ত ভগবানের মুখ নিঃসৃত বানী গীতার শ্লোক উল্লেখ করে সমস্যা সমাধানের পথ বাতলে দিতেন এবং সংসারে বা গৃহে অবস্থান করে কিভাবে ধর্মের পথে জীবন পরিচালিতকরন বা ধর্মাচরন করা যায় তা পথ- নির্দেশিকা প্রদান করতেন। এতে ভক্তরা সন্তুষ্ট চিত্তে গৃহে ফিরতেন এবং গীতার আদর্শে আকৃষ্ট হতেন। সংসার ক্লিষ্ট মানুষ তথা সাংসারিক দুঃখ- বেদনা- জ্বালা- মায়ামোহ থেকে মুক্ত হওয়ার একমাত্র মহৌষধ শ্রীমদ্ভাগবদগীতা। এটাই তিনি বদ্ধ জীবদের স্মরন করিয়ে দিতেন।
লীলা বিভূতি: সত্যানন্দ যতি মহারাজের লীলা বিভূতি তথা আধ্যাত্মিক মহিমা লোকমুখে সমাদৃত। উনার লীলা বিভূতি অনেকে স্বচক্ষে পর্যবেক্ষন করেছেন। পাপী-তাপিত জীবকে উদ্ধার, মানুষকে ধর্ম পথে পরিচালিত করার জন্য জনসমক্ষে এমন লীলা প্রদর্শন করতেন।
সুয়াবিলের পাশের গ্রামের জনৈক হোমিও চিকিৎসক খোকাবাবুর সন্তান নিউটন অসৎ সঙ্গে যাতায়াত করে সমাজ বিরোধী অহিতকর কাজে লিপ্ত হয়ে পড়েন। রীতিমত সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। এমন কর্মকান্ডে বিরক্ত হয়ে পরিবারের সদস্যরা আশ্রমে এসে নিউটনকে সত্যানন্দ বাবাজীর হাতে হস্তান্তর করেন। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে থাকার দরুন নিউটন উগ্র, অসামাজিক আচরন ও অধার্মিক চলন-বলনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। আশ্রমে আশ্রয় পেয়ে সত্যানন্দ বাবাজীর পরশে তাঁর অশান্ত মনে পরিবর্তন হতে শুরু করে। নিত্যদিনের প্রার্থনা সভায় যোগদান ও নিত্য গীতা পাঠে অংশ গ্রহণের ফলে সে ধীরে ধীরে সদ্ভাবে ফিরে আসতে থাকে। বিগত দিনের অসৎ কর্মকান্ডের জন্য অনুশোচনার ভাব উদয় হতে থাকে।
কিন্তু এই নিউটনের আশ্রমে অবস্থানের খবর তার বিরোধী পূর্বতন সন্ত্রাসীদের কাছে পৌঁছে যায় এবং তারা প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে হঠাৎ একদিন মোটর সাইকেল যোগে সংঘবদ্ধ হয়ে নিউটনকে তুলে নিয়ে হত্যা করার জন্য হন্যে হয়ে আশ্রম অঙ্গনে খুঁজতে থাকে, সত্যানন্দ বাবাজী আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরে অনন্যোপায় হয়ে নিউটনকে গোপনে সরিয়ে মুনিবাবার গর্ভমন্দিরে লুকিয়ে রেখে বাবাজী গুরুদাস বাবার মন্দিরে গীতা পাঠে অবগাহন করলেন এবং আশ্রমে উপস্থিত জনৈক ভক্তকে বললেন — আগন্তুকরা জিজ্ঞেস করলে বলবে — আমি গীতাপাঠে বসলে কথা বলি না, সন্ত্রাসীরা আশ্রমে এদিক-ওদিক খুঁজে নিউটনকে না পেয়ে ফিরে গেলেন। সত্যানন্দ বাবাজী ছিলেন অন্তযামী মহাপুরুষ, তিনি ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা, তিনি কৌশলে মিথ্যা বলা এড়িয়ে গেলেন এবং নিউটনকে প্রাণে বাঁচালেন, এটাও সত্যানন্দ যতি মহারাজের অহৈতুকী কৃপা এবং অপ্রাকৃত লীলা বিভূতি। পরবর্তী জীবনে নিউটন সন্ন্যাসী হয়ে কলকাতার রামকৃষ্ণ মিশনে আশ্রয় পেয়েছেন, নিউটনের পরিবার তথা পিতা-মাতা সগৌরবে মুক্তকণ্ঠে বলতেন — সত্যানন্দ বাবাজী প্রগাঢ় আধ্যাত্মিক ক্ষমতাসম্পন্ন লীলা-পুরুষোত্তম, ভগবান এভাবে পতিত জীবদের উদ্ধার করেন।
সুয়াবিল সিদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা মহাযোগীশ্বর ত্রিকালজ্ঞ গুরুদাস পরমহংসদেবের আবির্ভাব ও তিরোভাব তিথি একই দিন, বার-মাস হওয়ার প্রতি বৎসর শুভ তিথি মাঘী পূর্ণিমায় আশ্রম অঙ্গনে বিশাল মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়, মহোৎসবের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে পালা গান অন্যতম। পালা গান পরিবেশনের জন্য বিখ্যাত পালা কীর্তনীয়ারা আশ্রমে আসেন, সে সূত্রে ২০১৩ খ্রীষ্টাব্দে বিখ্যাত কবিয়াল বিষ্ণুপদ বাবু আশ্রমে এসেছিলেন, উৎসবের ধর্মসভার দিন রাত্রির শেষ প্রহরে পালা গান শেষে বিষ্ণুপদ বাবু সত্যানন্দ বাবাজীর সহিত সাক্ষাতের জন্য বাবাজীর অবস্থান রুমে পৌঁছে দরজা একটু ফাঁক করে বাবাজীর রুমে ঢুকতে গিয়ে এক অলৌকিক বিভূতি অবলোকন করেন, দৃশ্যে লক্ষ্য করলেন — বাবাজী বিনা বস্ত্রে পদ্মাসনে শূন্য ভাসমানঅবস্থায় সমাসীন হয়ে বিরাজ করছেন। বিষ্ণুপদ বাবু দর্শন করে হতমম্ভ ও আশ্চর্য্যান্বিত হলেন, তিনি পারস্পরিক বলাবলি করলেন সত্যানন্দ বাবাজী সাধন মার্গের উচ্চতম সাধক, কালজয়ী ব্রহ্মনিষ্ঠ মহাপুরুষ, তিনি কোন সাধারন গৈরিক বসনধারী সাধু নন, তার যোগ মহিমা অপার, গূঢ়, গুপ্ত ও রহস্যময়, উল্লেখ্য বিষ্ণুপদ বাবুদের গতানুগতিক ধারনা ছিল — বর্তমান যুগের সাধুরা অতীব সাধারন, সাধনার প্রখরতা বা সাধন মহিমা নেই কিন্তু পরম যোগী পুরুষ, জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ সত্যানন্দ বাবাজী বিষ্ণুপদ বাবুদের এ ভ্রম দূর করতেই বাবাজীর বিষ্ণুপদ বাবুর সামনেই এ যোগক্রিয়ার অভাবনীয় বহিঃপ্রকাশ।
এ থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় সত্যানন্দ যতি মহারাজ অলৌকিক লীলা বিভূতি সম্পন্ন পুরুষোত্তম। বাবাজীর এমন অলৌকিক ক্রিয়া আরো যারা দর্শন করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম পলাশের মা সবিতা, পার্থ ঘোষের মা অঞ্জলি ঘোষ সহ আরো অনেকে।
নব্বই বছরের ঊর্ধ্ব এক শয্যাশায়ী মরণাপন্ন বৃদ্ধা রমণী রানী বালা মজুমদার মুমূর্ষু অবস্থায়, সেই বৃদ্ধা রমণীকে ব্রহ্মজ্ঞানী জ্ঞানতাপস সত্যানন্দ বাবাজী তাঁর সাধন শক্তির জোরে আয়ু বর্ধিত করেছিলেন, বৃদ্ধার মরণাপন্ন অবস্থায় ভক্ত সমারোহে বৃদ্ধার শয়নকক্ষে উপস্থিত হয়ে বৃদ্ধার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে বৃদ্ধার পাশে বসে “ওঁ জনার্দ্দন মধুসূদন ওঁ”নাম ধ্বনি গাইলেন প্রায় অর্ধঘন্টা ব্যাপী খুব ভক্তি সহকারে ও ভারী গলায়। নাম ধ্বনি শেষে সত্যানন্দ বাবাজী ঐ গৃহকর্তাকে ডেকে বললেন — উনাকে আয়ুদান করলাম, আজ তিথি ভালো নেই , কালও ভালো ছিল না, এই খারাপ তিথিতে উনার যাত্রা হবে না। ঐ বৃদ্ধা মাতা কতই ভাগ্যবান, সত্যানন্দ বাবাজীর মতন মহাপুরুষের অহৈতুকী কৃপায় ধন্য হলেন এবং খারাপ তিথিতে প্রয়াণ থেকে রক্ষা পেলেন। সত্যানন্দ বাবাজীর মতো এমন তত্ত্বদর্শী ও সদগুরুর কৃপা পাওয়া জন্ম-জন্মান্তরের সু-সংস্কারের ফসল। উল্লেখ্য বাসগৃহটি ছিল আশ্রমের শ্রদ্ধাশীল ভক্ত ও সেবক শ্রীমান পার্থ ঘোষের চট্রগ্রামের ঘাটফরহাদবেগস্থ খলিফাপট্টির মামার বাসা।
১৪১২ বাংলার ২০০৬ খ্রীষ্টাব্দ মহান গুরু পূর্ণিমা তিথিতে আমরা সপরিবারে দীক্ষা প্রার্থী ছিলাম, দীক্ষা যজ্ঞের একপর্যায়ে আমার দীক্ষা যজ্ঞ সমর্পনের পর আমার সহধর্মিণী দীক্ষার গ্রহনের জন্য গুরুদাস বাবার মন্দিরে পূর্ব থেকে সমাসীন সত্যানন্দ বাবাজীর পার্শ্বে আসন গ্রহন করলে বাবাজী হঠাৎ বলে উঠলেন, তুমিতো আগে একবার দীক্ষা নিয়েছ। উল্লেখ্য আমার স্ত্রী কুমারী অবস্থায় অনুকূল ঠাকুরের দীক্ষা নিয়েছিল, দীক্ষা যজ্ঞ শেষে সে বাইরে এসে আমাদেরকে অবগত করলে — আমরা আশ্চর্য্যান্বিত ও হতমম্ভ হয়ে যায়। শ্রীমৎ স্বামী সত্যানন্দ যতি মহারাজ বাবাজী অন্তঃযামী মহাপুরুষ তা আর ব্যক্ত করার অপেক্ষা রাখে না, অলৌকিক মহাপুরুষের অপরিসীম লীলা।
২০০৯ খ্রীষ্টাব্দে আমার স্ত্রীর মরণঘাতি ব্যাধি ‘ব্রেস্ট ক্যান্সারের’ আলামত পরিলক্ষিত হয়, আমরা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে তিনি ক্যান্সার নির্ণয়ক ডায়াগনোসিস পরীক্ষা ‘মেমোগ্রাফী’ করার পরামর্শ প্রদান করেন। ‘বেলভিউ’ নামক ক্লিনিকে অবস্থিত ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে টেষ্ট করিয়ে বের হতেই আমার স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়েন। আমি তাকে আশ্বস্ত করে পরদিনই সিদ্ধাশ্রমে পরম দয়ালু গুরুদেবের নিকটে চলে যাই।
আশ্রমে অবস্থানরত গুরুদেবকে প্রণাম নিবেদনপূর্বক উল্লেখিত বিষয়ে উনাকে অবগত করলে উনি অভয় প্রদান করে গুরুদাস বাবার উপর ভরসা রাখার আহবান করলেন। আমরাও মহান গুরুদেবের আশ্বাসে নির্ভীক হলাম, তিনি উনার একজন পরিচিত ডাক্তার (ডাঃ সন্তোষ) কে ফোন করে আমাদেরকে উনার চেম্বারে সকালে যেতে বললেন। গুরুদেবের আশ্বাস বাণী পেয়ে আমরা নিশ্চিত্ত মনে বাড়ী ফিরলাম।
পরেরদিন যথারীতি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্রখ্যাত ডাক্তার সন্তোষের চেম্বারে উপস্থিত হয়ে দেখি — অপেক্ষমান রোগীদের লম্বা লাইন, আমি দায়িত্ব পালনরত কম্পাউন্ডারকে গুরুদেবের নাম উল্লেখ করে আমাদেরকে উনি পাঠিয়েছেন বললে, কম্পাউন্ডার ভিতরে গিয়ে ডাক্তারকে বলার সাথে সাথে ডাক্তার আমাদেরকে ভিতরে ডাকলেন, অপেক্ষমান অন্য রোগীদের অপেক্ষায় রেখেই আমরাই চিকিৎসা সেবা নেবার সুযোগ পেলাম। এটাই গুরুদেবের অহৈতুকী কৃপা, যিনি পীড়িত ভক্তদের রক্ষা করছেন, উনার কৃপা ছাড়া কি করে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা না করেও চিকিৎসায় সুযোগ পেলাম! এটাতো গুরুদেবের অপার মহিমা। অতঃপর ডা: সন্তোষের পরামর্শ মতে কক্স বাজারস্থ চকরিয়ার ‘ডুলাহাজরা খ্রীষ্টিয়ান হাসপাতালে একটি মিনি অপারেশনের স্বল্প খরচের মাধ্যমে আমার স্ত্রী ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেন। গুরু গোবিন্দের অলৌকিক কৃপায় এমন মহাবিপদ হতে আমরা উদ্ধার হলাম। এটা সত্যানন্দ বাবাজীর অলৌকিক লীলা বিভূতি, এমন গুরুদেবের শ্রী চরণে ভূয়ঃ ভূয়ঃ প্রণাম নিবেদন করছি।
সত্যানন্দ যতি মহারাজ বাবাজীর আরো অনেক লীলা মহিমার কথা প্রচারিত আছে ভক্ত শিষ্যগণের মুখে মুখে। বাবাজীর প্রয়ান দিবসের আগে উনার নিজ হাতে সমাধি স্থান পরিষ্কার করত সবার অগোচরে স্থান নির্ধারন করে গিয়েছিলেন।
২০১৫ খ্রীষ্টাব্দে পরম যোগীপুরুষ গুরুদাস পরমহংসদেবের শততম আবির্ভাব ও তিরোধান তিথি পালনের ও উদযাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় চট্টগ্রাম শহরস্থ ঐতিহাসিক জে.এম. সেন হল প্রাঙ্গনে। সেই অনুষ্ঠানের স্মরণিকা প্রকাশ ও অন্যান্য কাজ সারতে গুরুদেব আশ্রম প্রাঙ্গন ত্যাগ করার পূর্বক্ষনে (৮ই জানুয়ারী ‘২০১৫ খ্রীঃ) বর্তমান গুরুদাস বাবার মন্দিরের পশ্চিম পাশ্বস্থ অব্যবহৃত একটি জায়গা নিজহস্তে পরিষ্কার করেন। উপস্থিত অনেক ভক্ত কারন জিজ্ঞাসা করলেও তিনি নিরুত্তর ছিলেন। অতঃপর বাবাজী চট্টগ্রাম শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন গুরুদাস বাবার মন্দিরে প্রনাম নিবেদন করে, কথিত আছে, যাত্রাপথে সত্যানন্দ বাবাজী হালদা নদী পার হওয়ার সময় ঘাট পারাপারের ইজারাদার মো: হাসেমকে পাঁচশত (৫০০টাকা) টাকা প্রদান করে বললেন — আগামী দুইদিন আশ্রমে অনেক ভক্ত সমাগম হবে তাদের বিনা টাকায় পারাপার করবে, অথচ ঐ উল্লিখিত দিনে আশ্রমে কোন অনুষ্ঠান বা উৎসব ছিল না, কিন্তু ঐদিন যখন সত্যানন্দ বাবাজীর অপ্রত্যাশিত ও অনাকাংক্ষিত সড়ক দুর্ঘটনার খবর পৌঁছাল আশ্রমে এবং ভক্তদের মাঝে তখন সবাই ঐ অলৌকিক কার্যাবলীর সারমর্ম বুঝতে পেরেছিলেন।
সত্যানন্দ বাবাজী অনেক উচ্চ মার্গের সাধক ছিলেন, ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা ছিলেন, বাকসিদ্ধ মহাপুরুষ ছিলেন, তার স্বতঃসিদ্ধ প্রমান বাবাজীর এহেন অলৌকিক ক্রিয়া, গভীর সাধন ক্রিয়ার উত্তীর্ণ সাধকরাই এমন অলৌকিক লীলা বিভূতি সংঘটিত করতে পারেন।
জয় সত্যানন্দ যতি মহারাজ বাবাজীর জয়, আরো অনেক লীলা বিভূতির মহিমা ভক্ত শিষ্য ও আশ্রমবাসীরা অবলোকন করেছেন বাবাজীর জীবদ্দশায়।
মহাপ্রয়ান: — পৌষ মাসের ২৩ তারিখ ১৪২১ বঙ্গাব্দ, ৮ই জানুয়ারী ২০১৫ খ্রীষ্টাব্দ। গুরুদাস পরমহংসদেবের উৎসবের প্রয়োজনীয় কাজ সারতে চট্টগ্রাম শহরে যাত্রা করেছিলেন, প্রাক্কালে অন্যদিনের যাত্রার মতো তড়িৎ পদক্ষেপে না বেরিয়ে ধীরে ধীরে গুরুদাস বাবার মন্দিরের দিকে অনেকক্ষন দৃষ্টি নিবন্ধ করে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এবং যাত্রাপথে মন্দিরের দিকে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছিলেন যেন আজ যাওয়ার ইচ্ছা নেই। ফকির বাবার মন্দির যেন ছাড়তে মন সায় দিচ্ছিলনা। তবুও দায়িত্বের খাতিরে শহরের পানে হালদা নদীর তীরে ছুটলেন, হালদা নদী পার হয়েই শহরের পথ ধরলেন।
চট্টগ্রাম শহরে ফকির বাবার উৎসব উপলক্ষে ‘স্মরনিকা’ ছাপানোর জন্য অটোরিকশা যোগে আন্দরকিল্লা মোড়ে নগরীর আন্দরকিল্লা প্রেস পাড়ায় যাচ্ছিলেন, হঠাৎ দৈব ক্রিয়ায় গনি বেকারীর মোড়ে চলন্ত অবস্হায় রিক্সা উল্টে গিয়ে সত্যানন্দ বাবাজী রাস্তায় ছিটকে পড়েন। পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর জখম প্রাপ্ত হন এবং গুরুদাস পরমহংসদেবের ঐশী আদেশে দেহত্যাগ করে পরমধামে লীন হয়ে যান, মেডিকেল কলেজে স্থানান্তর হলে চিকিৎসকেরা আর কিছু করতে পারেন নি।
এমন হৃদয়বিদারক খবর আশ্রম অঙ্গনসহ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে ভক্ত শিষ্যদের হাহাকার পড়ে যায়, কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না, এমন অনাকাংক্ষিত ও অনভিপ্রেত ঘটনা, এটাই হয়তো নিয়তি, যেটা খন্ডন করার কারো সাধ্য নেই।
এর পরদিন বাবাজীকে আশ্রমে নিয়ে আসা হলে, ভক্তদের গগনবিদারী আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠে। হাজার হাজার ভক্ত বাবাজীকে দর্শন করতে আশ্রম প্রাঙ্গনে ছুটে আসেন, বিভিন্ন মঠ মন্দিরের সাধু মহাত্মারা আশ্রম প্রাঙ্গনে সমবেত হয়ে বাবাজীকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন, সর্বস্থানে শোকাচ্ছন্ন পরিবেশ হঠাৎ এমন দুর্ঘটনার ঘটনায় ভক্ত শিষ্যরা মুচড়ে গিয়েছিলেন।
অতঃপর অনেক সাধু-মহাত্মা-ভক্ত সাধু ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে হাজার হাজার মানুষের উপস্হিতির মাধ্যমে বাবাজীকে গুরুদাস বাবার মন্দিরের পাশে মহাযজ্ঞ শাস্ত্রীয় ক্রিয়া সমাপনান্তে সমাধিস্থ করা হয়, গুরুদাস বাবার কোলেই আশ্রয় পেলেন আমাদের পরমপূজ্য, পরম ধ্যায়, শ্রীগুরু ভগবান, দেহ সমাধিস্হ হলেও উনি আত্মাস্বরূপ, আত্মা অবিনাশী, অক্ষয়, অব্যয়, অজেয়। বাবাজীরা চির-অমর, পরম ব্রহ্মে লীন হয়েছেন বাবাজী। চিরদিন চিরকালের জন্য ব্রহ্মলোকে ঠাঁই নিলেন আমাদের পরমারাধ্য শ্রীগুরুদেব।
উপসংহার : এই মহাপুরুষের মহাপ্রয়াণ হয়েছে কিন্তু তিনি চিরভাস্বর থাকবেন ভক্ত শিষ্যদের হৃদয়ে, গুরুদাস বাবার আশ্রমের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে মুদ্রিত থাকবে বাবাজীর নাম, বাবাজীর সাধন মহিমার প্রভাব যুগে যুগে আলোকিত করবে সুয়াবিল সিদ্ধাশ্রমকে। সাধন জগতের এ উজ্জ্বল নক্ষত্র চিরকাল দেদীপ্যমান থাকবে মুমুক্ষু বা কৈবল্যপ্রাপ্তির সাধনায় রত সাধকদের, উনার অনুসৃত পথেই মিলবে মুক্তি বা মোক্ষ। তিনি জগতের সকল ভক্ত, শিষ্য ও সাধকগণের নিকট অনুপ্রেরণা হয়ে চিরদিন পূজনীয় হয়ে থাকবেন, বাবাজী মৃত্যুঞ্জয়ী ওঅমর সত্তা।
জয়গুরু, জয় গুরুদেবের জয়।
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন