সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইয়ার্ডটির স্বত্বাধিকারী ও প্রধান কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং পাসপোর্ট জব্দের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। একই সঙ্গে শিল্প, পরিবেশ ও শ্রম মন্ত্রণালয়সহ ১২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আইনি ও আদালত অবমাননার নোটিশ দিয়ে তিন দিনের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ জানাতে আল্টিমেটাম দিয়েছে সংগঠনটি।
গত রোববার পাঠানো দুটি পৃথক নোটিশে বেলা অভিযোগ করেছে, হাইকোর্টের একাধিক রায় ও নির্দেশনা উপেক্ষা করেই ফেরদৌস স্টিলে জাহাজভাঙা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়, ১৪ আগস্ট ভাটিয়ারীর ওই ইয়ার্ডে ‘এমটি রাসি’ নামের এলএনজি ট্যাংকার কাটার সময় গ্যাস নিঃসরণে অন্তত ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অত্যন্ত বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে।
বেলার নোটিশে দাবি করা হয়েছে, ফেরদৌস স্টিলে এ ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা নতুন নয়। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত একই ইয়ার্ডে অন্তত পাঁচবার একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বিভিন্ন জেলা থেকে আসা প্রশিক্ষণহীন ও অদক্ষ শ্রমিক নিহত ও আহত হয়েছেন। নিহত ও আহতদের অধিকাংশই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নতুন ছিলেন এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন না বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়, জাহাজভাঙা শিল্পে দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাইকোর্ট একাধিক মামলায় গ্যাস-ফ্রি সার্টিফিকেট নিশ্চিত করা, কালো তালিকাভুক্ত দেশ থেকে জাহাজ আমদানি নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ফেরদৌস স্টিলের সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা প্রমাণ করেছে, এসব নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
বেলা আরো বলেছে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বিপজ্জনক বর্জ্য ও জাহাজ ভাঙার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১১ এবং জাহাজ ভাঙা ও পুনর্ব্যবহার বিধিমালা, ২০১১-এও হাইকোর্টের নির্দেশনার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেনি। এর ফলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার পরিবর্তে জাহাজভাঙা শিল্পের বাণিজ্যিক স্বার্থ অগ্রাধিকার পেয়েছে বলে নোটিশে অভিযোগ করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বেলা।
সংগঠনটির দাবি, জাহাজভাঙা শিল্প নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার প্রতিনিধিদের দিয়েই তদন্ত করানো হচ্ছে, যা স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে। তাই সংশ্লিষ্ট সংস্থার বাইরে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
ফেরদৌস স্টিলে নিরাপত্তা ঘাটতির বিষয়টি নতুন নয়। দুর্ঘটনার প্রায় ছয় মাস আগে সরকারি পরিদর্শন সংস্থা ইয়ার্ডটিতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতার অভাব, ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন না দেয়া এবং শ্রম আইনের বিভিন্ন লঙ্ঘনের অভিযোগ শনাক্ত করেছিল। একই সঙ্গে যে ‘এমটি রাসি’ জাহাজে দুর্ঘটনা ঘটে, সেটি কাটার জন্য ২০২৫ সালের জুলাইয়ে পরিবেশ অধিদফতরের ৫২৯তম সভায় ছাড়পত্রের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল।
বেলা নোটিশে জানিয়েছে, নোটিশ পাওয়ার তিন দিনের মধ্যে গৃহীত পদক্ষেপ জানাতে হবে। অন্যথায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ এনে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন