চট্টলার কণ্ঠ ডেস্কঃ সরকারের সবচেয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন ( বিএসসি) বিগত এক বছরে নিয়েছে একের পর এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। যা বিএসসির সক্ষমতাকে অনেক গুন বাড়িয়ে দিয়েছে। লাভের পথেই হাঁটছে এই প্রতিষ্ঠানটি। বিএসসির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক দ্বায়িত্ব নেয়ার পর থেকে বিএসসিকে বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের দিকে নিয়ে গেছেন। তার দূরদর্শী নেতৃত্বে বিএসসির আজকের অর্জন ও ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত হয়েছে। সেই সাথে বর্তমান নৌ মন্ত্রণালয়ের দ্বায়িত্বে থাকা উপদেষ্টার আন্তরিক প্রচেষ্টা ,বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও সঠিক দিক নির্দেশনার ফলশ্রুতিতে বিএসসি উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথেই এগুচ্ছে এটা বলাবাহুল্য।
নিজস্ব অর্থায়নে শিগগিরই যুক্ত হচ্ছে আরও দুটি মাদার ভেসেল।বছরে আয় হবে ২০০ কোটিঃ চলতি বছরের সেপ্টেম্বরেই নতুন দুটি জাহাজ যুক্ত হবে বিএসসির বহরে, এমনটাই প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। যা এই প্রতিষ্ঠানকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।চীন থেকে পুরোপুরি প্রস্তুত জাহাজ কেনা হবে। আর আগস্টেই যুক্ত হবে শিপিং করপোরেশনের বহরে।অন্তত ২০ বছর পণ্য বহনে সক্ষম এসব জাহাজ থেকে বছরে ২০০ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বিএসসি। এরমধ্যে সংস্থাটির বছরে লাভ হবে দেড়শ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে আগস্ট কিংবা সেপ্টেম্বরেই শুরু হবে জাহাজ দুইটির বাণিজ্যিক যাত্রা।জাহাজ দুটি কেনার জন্য ৯৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে এবং এটি বিএসসির ইতিহাসে প্রথম নিজস্ব অর্থায়নে জাহাজ কেনার ঘটনা।
গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে নিজেদের টাকায় দুইটি মাদার ভ্যাসেল কেনার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল বিএসসি। তবে নানামুখী জটিলতায় বার বার সেই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অবশেষে চলতি মাসেই টেন্ডার আহ্বানের মাধ্যমে শুরু হয়েছে জাহাজ কেনার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া। প্রতিটি জাহাজের সম্ভাব্য দর ধরা হয়েছে ৪৫০ থেকে ৪৭৫ কোটি টাকা। আর জাহাজ কেনার পুরো টাকা দেয়া হবে বিএসসির নিজস্ব তহবিল থেকেই।
স্বাধীনতার পর বিএসসির বহরে জাহাজ ছিল ৩৫টি। তবে নানা দুর্ঘটনা ও জটিলতায় কমতে কমতে জাহাজ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫টিতে। এদিকে চলতি বছরেই যুক্ত হচ্ছে সাড়ে ৯০০ কোটি টাকা দামের ২টি জাহাজ। আর এতে কর্মসংস্থান হবে অন্তত ১০০ নাবিকের।
আরও পড়ুনঃ
বিএসসির নতুন জাহাজ ক্রয়;আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অনন্য নজির!
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অনুযায়ী, যে কোনো দেশের সমুদ্র বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ দেশীয় ক্যারিয়ার, ৪০ শতাংশ বিদেশি ক্যারিয়ার এবং বাকি ২০ শতাংশ দেশি ও বিদেশি ক্যারিয়ার যৌথভাবে পরিচালনা করে। বর্তমানে বাংলাদেশি মালিকানাধীন ১০২টি জাহাজ দিয়ে মাত্র ১১ শতাংশ পণ্য বহন সক্ষম। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে। দেশের মেরিটাইম খাতের সক্ষমতাও বাড়বে।
বিএসসি সূত্রে জানা গেছে, এই দুটি জাহাজ ছাড়াও তারা কোরিয়া থেকে ৬টি কনটেইনার জাহাজ কেনার পরিকল্পনা করছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বিএসসির বহরে মোট ২২টি জাহাজ যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
যুক্ত হচ্ছে দুটি বাল্ক কেরিয়ার জাহাজঃ ৫৫ থেকে ৬৬ হাজার ডিডব্লিউটি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ ক্রয়েই দ্বারপ্রান্তে বিএসসি। এরজন্য দরপত্র উন্মুক্তকরণ, মূল্যায়ন, কারিগরি ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতে দরপত্র প্রক্রিয়াকরণের লক্ষ্যে তিনটি উপ কমিটি গঠন করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।খুব সহসায় দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ যুক্ত হবে বিএসসির বহরে। এই জাহাজ দুটি মূলত অপরিশোধিত তেল এবং বাল্ক কার্গো পরিবহনে ব্যবহৃত হবে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন বিএসসির আয় বৃদ্ধি পাবে, তেমনি দেশের তেল পরিবহনে অর্থ সাশ্রয় হবে।
ক্ষতিপূরণ আদায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মর্যাদা ও দক্ষতার উজ্জ্বল প্রতিফলনঃ বিএসসি আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে। সুইজারল্যান্ডের একটি চার্টারারের অধীনে বাণিজ্যে নিয়োজিত এম.টি বাংলার অগ্রগতি জাহাজ ইন্দোনেশিয়ার তিনটি বন্দর থেকে ভেজিটেবল অয়েল পরিবহনের সময় পাঁচটি কার্গো ট্যাংকের কোটিং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় বিরোধ সৃষ্টি হয়। আইনি ঝগড়ার পরিবর্তে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া অবলম্বন করে বিএসসি ক্ষতিপূরণ আদায় করে, যা দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মর্যাদা ও দক্ষতার উজ্জ্বল প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
গত ১৮ মার্চ লন্ডনে অনুষ্ঠিত একদিনব্যাপী মেডিয়েশন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় বিএসসির তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল, যার নেতৃত্ব দেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক। ইংল্যান্ডের খ্যাতনামা আইনজ্ঞ ও নিরপেক্ষ মিডিয়েটর স্টিফেন মিলস মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ছিলেন।
সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে কঠোর আলোচনা ও দরকষাকষি। দক্ষ কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা, আন্তর্জাতিক বিধি-বিধান ও যুক্তির ভিত্তিতে বিএসসি ৩.৫ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৩ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ আদায় করতে সক্ষম হয়, যা আন্তর্জাতিক পরিসরে এক নজিরবিহীন সাফল্য।
৩৮ বছরের পুরনো ও ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ বিক্রিঃ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের(বিএসসি) মালিকানা ধীন ‘বাংলার জ্যোতি’ ও ‘বাংলার সৌরভ’ জাহাজ দুটি করসহ ৪৫ কোটি ৮৬ লাখ ৬১ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। সীতাকুণ্ডের পুরোনো জাহাজভাঙা ইয়ার্ড জিরি সুবেদার শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ জাহাজ দুটি কিনে নিয়েছে।
গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরের ডলফিন অয়েল জেটিতে নোঙর করে রাখা বিএসসির তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজ ‘এমটি বাংলার জ্যোতি’তে বিস্ফোরণ থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তাতে ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত হয়েছিলেন। এরপর ৫ অক্টোবর মধ্যরাতে কোম্পানিটির আরেকটি ট্যাংকার ‘এমটি বাংলার সৌরভ’–এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তাতেও এক নাবিক নিহত হন। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে এই দুটি ট্যাংকার জাহাজে অগ্নিকাণ্ডে চারজনের মৃত্যু হয়। এরপরই ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ দুটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
সূত্র জানায়, এমটি বাংলার জ্যোতি এবং এমটি বাংলার সৌরভ ট্যাংকার দুটি ১৯৮৮ সালে মোট ৬০ কোটি টাকায় ডেনমার্ক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। ট্যাংকার দুটির প্রতিটির তেল পরিবহন ক্ষমতা ১৪ হাজার ৫৪১ টন। গত ৩৮ বছরে ট্যাংকার দুটি ৪ কোটি ২৫ লাখ টন তেল পরিবহন করেছে। এতে বিএসসি প্রায় ৬০৭ কোটি টাকা নিট আয় করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বাধীনতার মাত্র এক বছর পর ১৯৭২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করে বিএসসি। ১৯৭২ সালে ‘বাংলার দূত’ ও ১৯৭৩ সালে ‘বাংলার সম্পদ’ নামে জাহাজ যুক্ত হয় বিএসসিতে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিএসসি এ পর্যন্ত ৪৪টি জাহাজ সংগ্রহ করে। বয়সের কারণে একের পর এক স্ক্র্যাপ হওয়া এবং দুর্ঘটনাজনিত কারণসহ ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩৯টি জাহাজ বিক্রি করা হয়। গেলো বছরের অক্টোবরে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ৩৭ বছরের পুরনো এমটি বাংলার সৌরভ ও এমটি বাংলার জ্যোতি জাহাজ দুটি অগ্নিকাণ্ডে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই দুটি জাহাজ স্ক্র্যাপ হিসেবে পরবর্তী সময়ে ৫৫ কোটি টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হলে বিএসসিতে জাহাজের বহর নেমে আসে মাত্র পাঁচটিতে। বর্তমানে বিএসসির বহরের জাহাজগুলো হলো এমভি বাংলার জয়যাত্রা, এমভি বাংলার অর্জন, এমটি বাংলার অগ্রগতি, এমটি বাংলার অগ্রযাত্রা এবং এমটি বাংলার অগ্রদূত। শীগ্রই যুক্ত দুটি মাদার ভেসেল ও দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ।
আর্থিক সক্ষমতাঃ এর মধ্যে ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ২৪৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা বার্ষিক মুনাফা করেছে বিএসসি। এটি সংস্থাটির ৫৩ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মুনাফার মাইলফলক বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগের বছর ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ২৪৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছিল।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এমন কৌশলী ও পেশাদার সমস্যা সমাধানের দৃষ্টান্ত বিরল। এই সফল মেডিয়েশন প্রক্রিয়া যেমন আইনি ব্যয়ের ঝুঁকি কমিয়েছে, তেমনি শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির সক্ষমতাও তুলে ধরেছে। দেশের অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি হতে পারে একটি রোডম্যাপ—যেখানে সাহস, প্রস্তুতি ও কৌশলগত যোগাযোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
তিনি বলেন, নৌ মন্ত্রণালয়ের দ্বায়িত্বে থাকা মাননীয় উপদেষ্টা মহোদয়ের আন্তরিক প্রচেষ্টা ,বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও সঠিক দিক নির্দেশনার ফলশ্রুতিতে বিএসসিতে আমুল পরিবর্তন এসেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিএসসির সার্বিক সক্ষমতাকে অনেক গুন বাড়িয়ে দিবে। নিজস্ব অর্থায়নে জাহাজ ক্রয় এটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা সেই চ্যালেঞ্জ নিতে সক্ষম হয়েছি। আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের মধ্য দিয়ে দুটি বাল্ক কেরিয়ার ক্রয়ের কাজ চলামান আছে । খুব শিগ্রই বিএসসির বহরে যুক্ত হচ্ছে দুটি বাল্ক কেরিয়ার জাহাজ। যা আমাদের বাণিজ্যিক সক্ষমতাকে বাড়িয়ে দিবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন সরকারের একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসাবে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলেছে।বিএসসিকে যুগোপযোগী ও আধুনিকায়তন করার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। আমরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, খুব শিগ্রই বিএসসির বহরে আসছে দুটি নতুন জাহাজ। ‘বিএসসির ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ কেনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। বিগত এক বছরে বেশ কিছু উল্লেখ যোগ্য সাফল্য এসেছে। আমরা এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাই।
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন