লেখক: রিদুয়ানুল হাকীম রিয়াদ
বাংলাদেশ আজ জনসংখ্যার সুবিধা (Demographic Dividend) কাজে লাগিয়ে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। অবকাঠামো, অর্থনীতি, ডিজিটালাইজেশন এবং সামাজিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত এখনও নীতি নির্ধারণের মূলধারায় যথাযথ গুরুত্ব পায়নি, সেটি হলো মানসিকস্বাস্থ্য।
মানসিক স্বাস্থ্য কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এটি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা, সামাজিক স্থিতিশীলতা, পরিবার, নারী ও শিশু সুরক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বিচার ব্যবস্থা এবং জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একজন মানুষের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা মানে একটি পরিবার, একটি কর্মক্ষেত্র এবং একটি সমাজকে সুস্থ রাখা।
বাংলাদেশে উদ্বেগজনক ভাবে বাড়ছে বিষণ্নতা, উদ্বেগজনিত সমস্যা (Anxiety), আত্মহত্যা, মাদকাসক্তি, সাইবার বুলিং, পারিবারিক সহিংসতা, শিক্ষাগত চাপ, জলবায়ু জনিত মানসিক ট্রমা এবং কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য দক্ষ মানবসম্পদ, বাজেট এবং সেবা অবকাঠামো অত্যন্ত সীমিত।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১৬.৮ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্ক এবং ১৩.৬ শতাংশ শিশু-কিশোর কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২.৩ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ৯৪.৫ শতাংশ কোনো ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা পান না।অর্থাৎ চিকিৎসা ও সেবার বিশাল ঘাটতি (Treatment Gap) এখনও বিদ্যমান।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬০ লক্ষেরও বেশি মানুষ বিষণ্নতা এবং প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ উদ্বেগ জনিত সমস্যায় আক্রান্ত। প্রতিবছর ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেন, যার একটি বড় অংশ তরুণ জনগোষ্ঠী। গবেষণায় দেখা যায়, পরীক্ষার চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য, সম্পর্কের সংকট এবং অনলাইন হয়রানি আত্মহত্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়িয়ে দেয়।
সবচেয়ে হতাশাজনক বাস্তবতা হলো, দেশে প্রতি একলাখ মানুষের জন্য মাত্র ০.৩৪ জন মনোবিজ্ঞানী, ০.১৬ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ০.৪ জন মানসিক স্বাস্থ্য নার্স রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় এটি অত্যন্ত কম। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ ঢাকা-কেন্দ্রিক হওয়ায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের মানুষ কার্যত সেবা থেকে বঞ্চিত।
বাংলাদেশ সরকার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারী ও শিশু, সমাজকল্যাণ, যুবউন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, কারাগার, পুলিশ, প্রতিবন্ধিতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও বাস্তবে অধিকাংশ প্রকল্পে মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ বাধ্যতামূলক নয়। যেখানে নিয়োগ হয়, সেখানেও অধিকাংশ পদ প্রকল্প ভিত্তিক ও চুক্তি ভিত্তিক। প্রকল্প শেষ হলে চাকরিও শেষ হয়ে যায়। এতে দক্ষ পেশাজীবীরা দীর্ঘমেয়াদে এই পেশায় থাকতে নিরুৎসাহিত হন এবং জনগণ ধারাবাহিক সেবা থেকে বঞ্চিত হন।
বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে, এনজিও, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত সাইকোলজিস্ট, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্টদের অনেকেই তুলনামূলক কম বেতন, সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং অনিশ্চিত কর্ম পরিবেশে কাজ করেন। পেশাগত মর্যাদা, ক্যারিয়ার পথ এবং পদোন্নতির সুস্পষ্ট কাঠামো না থাকায় মেধাবী শিক্ষার্থীদের অনেকেই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হন।অন্যদিকে বাস্তবতা হলো, বেসরকারি হাসপাতাল, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, এনজিও, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ, শিল্প প্রতিষ্ঠান, পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে দক্ষ মনোবিজ্ঞানীদের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সেই চাহিদা পূরণের মতো প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি হচ্ছেনা।
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত ঢাবি, রাবি, জবিতে ক্লিনিক্যাল, কাউন্সেলিং এবং স্কুল সাইকোলজি থাকলেও চাহিদার তুলনায় অ্যাপ্লাইড ট্র্যাক এখনও পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী Clinical Psychology, Counselling Psychology, School Psychology, Forensic Psychology, Organizational/Industrial Psychology, Health Psychology, Rehabilitation Psychology এবং Neuropsychology-এর মতো বিশেষায়িত অ্যাপ্লাইড কোর্স চালু করা জরুরি।
বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে একজন ক্লিনিক্যাল বা কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট হতে শত শত ঘণ্টার Supervised Clinical Practice, বাধ্যতামূলক Internship, Case Conference, Psychological Assessment, Evidence-based Therapy এবং নিয়মিত Professional Supervision সম্পন্ন করতে হয়। বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক মানের ন্যূনতম ৬০০ থেকে ১,০০০ ঘণ্টার সুপারভিশন ভিত্তিক প্রশিক্ষণ, জাতীয় লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, Continuing Professional Development (CPD) এবং National Registration Council গঠন এখন সময়ের দাবি।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC), শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের মধ্যে সমন্বিত নীতি ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
আজকের পৃথিবীতে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয় নয়, এটি স্কুল থেকেই শুরু হওয়া উচিত। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক ভাবে Mental Health Literacy, Psychological First Aid (PFA), Stress Management, Anger Management, Emotional Regulation, Resilience Building, Suicide Prevention, Suicide Ideation শনাক্তকরণ, Self-harm Management, Bullying ও Cyberbullying Prevention, Safe Internet Use, Conflict Resolution, Peer Support Skills, Help-seeking Behaviour, Gender Sensitivity, Substance Abuse Prevention, Exam Anxiety Management, Communication Skills এবং Life Skills অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন প্রশিক্ষিত স্কুল সাইকোলজিস্ট থাকলে শিক্ষার্থীদের আচরণ গত পরিবর্তন, আত্মহত্যার ঝুঁকি, মাদকাসক্তি, সহিংসতা, অনুপস্থিতি, শিক্ষাগত চাপ এবং মানসিক সংকট প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে।
একইভাবে প্রতিটি জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থায়ী ক্লিনিক্যাল বা কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট নিয়োগ দিতে হবে। নারী ও শিশুনির্যাতন প্রতিরোধ, ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, কারাগার, পুলিশ, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন, প্রতিবন্ধী সেবা, মাদক পুনর্বাসন এবং কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার জন্য ওপৃথক মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ অপরিহার্য।
বাংলাদেশের নতুন সরকার ও জাতীয় সংসদের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন। তবে বক্তব্যের চেয়ে এখন বেশি প্রয়োজন বাস্তবায়ন। জাতীয় বাজেটে মানসিক স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, গবেষণায় বিনিয়োগ, জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ কৌশল বাস্তবায়ন, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কমিশন গঠন এবং সরকারি অর্গানোগ্রামে স্থায়ী মনোবিজ্ঞানীর পদ সৃষ্টি এখন আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই।
সরকার চাইলে আগামী পাঁচ বছরে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। এজন্য প্রয়োজন:
মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ। বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, বিষণ্নতা ও উদ্বেগের কার্যকর চিকিৎসায় বিনিয়োগ করলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে বহুগুণ অর্থনৈতিক লাভ সম্ভব।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট রোগীর সংখ্যা নয়, বরং দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি, সীমিত প্রশিক্ষণ, দুর্বল নীতিগত সমন্বয় এবং স্থায়ীপদের অভাব। এখনই সময় বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার, পেশাজীবী সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করার।
একটি সুস্থ বাংলাদেশ গড়তে যেমন দক্ষ চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও শিক্ষক দরকার, তেমনি দরকার দক্ষ মনোবিজ্ঞানীও। কারণ মানসিক ভাবে সুস্থ মানুষই পারে একটি মানবিক, উৎপাদনশীল, সহনশীল এবং টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। মানসিক স্বাস্থ্য আর অবহেলার বিষয় নয়, এটি এখন জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হওয়া উচিত।
লেখক: রিদুয়ানুল হাকীম রিয়াদ,
ইয়াং ডেভেলপমেন্ট এন্ড হিউম্যান রাইটস এক্টিভিস্ট,
চট্টগ্রাম.
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন