মানবসেবা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য নাম লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী এই সংগঠন আজ মানবকল্যাণে এক শক্তিশালী বৈশ্বিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। “We Serve” মূলমন্ত্রকে ধারণ করে লায়ন্স সদস্যরা যুগের পর যুগ ধরে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন। মানবিক মূল্যবোধ, নেতৃত্বের বিকাশ এবং সমাজ উন্নয়নের প্রত্যয়ে পরিচালিত এই আন্দোলন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সফল সেবামূলক উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃত।
বিশ্বে লায়নিজমের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস:
১৯১৭ সালের ৭ জুন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক মেলভিন জোন্স-এর উদ্যোগে লায়ন্স ক্লাবস ইন্টারন্যাশনাল এর যাত্রা শুরু হয়। তাঁর বিশ্বাস ছিল শুধু ব্যবসায়িক সফলতা নয়, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাও একজন মানুষের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। সেই চিন্তা থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় এই মানবিক সংগঠন। প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই লায়ন্স আন্দোলন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ১৯২৫ সালে অন্ধত্ব প্রতিরোধে কাজ করার আহ্বান সংগঠনটির অন্যতম প্রধান সেবামূলক কর্মসূচিতে পরিণত হয়। পরবর্তীতে স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুধা নিরসন, পরিবেশ সংরক্ষণ, ডায়াবেটিস সচেতনতা, শিশুদের সহায়তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও যুব উন্নয়ন কার্যক্রমও লায়ন্স আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। বর্তমানে বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশ ও ভৌগোলিক অঞ্চলে প্রায় ১৪ লাখের বেশি সদস্য মানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল বৈশ্বিক মানবকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে লায়নিজমের বিকাশ:
বাংলাদেশে লায়ন্স আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রামের মাধ্যমে। এদেশে লায়নিজমের পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত এম. আর সিদ্দিকী এদেশে লায়ন্স আন্দোলন প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। তাঁর উদ্যোগেই প্রথম লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং গঠিত হয় এবং পরবর্তীতে ঢাকাতেও লায়ন্স কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়। এম. আর সিদ্দিকী শুধু সংগঠন প্রতিষ্ঠাই নয়, বরং মানবসেবামূলক কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চট্টগ্রাম লায়ন্স আই হসপিটাল ও পরবর্তীতে বাংলাদেশ লায়ন্স ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে তাঁর নেতৃত্বে এদেশে লায়ন্স ক্লাবসমূহ সমাজসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে এবং স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সহায়তা, শিক্ষা বিস্তার ও চিকিৎসা সেবায় লায়ন্স সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের লায়ন্স আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলায় অসংখ্য লায়ন্স ও লিও ক্লাব সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড কিংবা অন্যান্য দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প, রক্তদান কর্মসূচি, খাদ্য বিতরণ, শিক্ষা উপকরণ প্রদান এবং বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমে লায়ন্স সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের মানুষের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশে লিও আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সমাজসেবার পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে নৈতিকতা, নেতৃত্বগুণ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরিতে লিও ক্লাবসমূহ কাজ করে যাচ্ছে।
জেলা ৩১৫-বি৪, বাংলাদেশের গৌরবময় অগ্রযাত্রা:
লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল, জেলা ৩১৫-বি৪,বাংলাদেশ, দেশের অন্যতম সক্রিয় ও সেবামুখী জেলা হিসেবে পরিচিত। চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন লায়ন্স ও লিও ক্লাব নিয়ে গঠিত এই জেলা মানবসেবামূলক কর্মকাণ্ডে ধারাবাহিক সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছে। এই জেলার ক্লাবসমূহ নিয়মিতভাবে চক্ষু চিকিৎসা সহায়তা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, খাদ্য ও বস্ত্র বিতরণ, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পরিবেশ সচেতনতা এবং মানবিক সহায়তামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। একই সঙ্গে সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদার করতে বিভিন্ন সাংগঠনিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনও করা হয়। জেলা বি-৪ এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তরুণ নেতৃত্ব তৈরিতে তাদের বিশেষ গুরুত্ব প্রদান। লিও ক্লাবসমূহের মাধ্যমে তরুণদের সমাজসেবামূলক কাজে সম্পৃক্ত করে একটি মানবিক ও দায়িত্বশীল প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
২৯তম জেলা কনভেনশন ২০২৬:
সেবার অঙ্গীকারে নতুন প্রত্যয়ে ২৯তম বার্ষিক জেলা কনভেনশন ২০২৬, লায়ন্স সদস্যদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক আয়োজন। প্রতিবছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লায়ন্স ও লিও সদস্যদের মিলনমেলায় পরিণত হবে এই কনভেনশন।
কনভেনশনে বর্ণাঢ্য র্যালি, প্রতিনিধি সভা, ওয়ার্কশপ, নেতৃত্ব উন্নয়ন সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পুরস্কার প্রদান এবং বিভিন্ন সামাজিক বার্তাভিত্তিক পরিবেশনার আয়োজন করা হয়েছে। কনভেনশনের মূল লক্ষ্য শুধু সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা নয়; বরং সদস্যদের মধ্যে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবসেবার চেতনাকে আরও শক্তিশালী করা।
এবারের কনভেনশনে বিশ্বব্যাপী মানবিক সংকট, সামাজিক বিভাজন এবং সহিংসতার প্রেক্ষাপটে ঐক্য ও মানবতার বার্তা বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। জেলা গভর্নর লায়ন মোছলেহ উদ্দিন আহমেদ অপু পিএমজেএফ এর প্রেরণাদায়ী আহ্বান “Unity Makes Prosperity” “একতাতে সমৃদ্ধি” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জেলার বিভিন্ন ক্লাব তাদের বর্ণাঢ্য পরিবেশনা ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমাজে শান্তি, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির বার্তা তুলে ধরছে। তাঁর নেতৃত্বে এবারের কনভেনশন শুধু একটি সাংগঠনিক আয়োজন নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ, ঐক্য ও সেবার এক বৃহৎ মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে।
এছাড়াও আইপিডিজি লায়ন কোহিনূর কামাল এমজেএফ, ১ম ভাইস জেলা গভর্নর লায়ন মো. কামরুজ্জামান লিটন এমজেএফ এবং ২য় ভাইস জেলা গভর্নর লায়ন মো. আবু বক্কর সিদ্দিকী পিএমজেএফ এর দিকনির্দেশনা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং আন্তরিক সহযোগিতায় পুরো কনভেনশন আয়োজন আরও গতিশীল, সুশৃঙ্খল ও সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জেলা ৩১৫-বি৪-এর লায়নিজম আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব বিকাশের পথ আরও সুগম হচ্ছে। এই কনভেনশন এর মাধ্যমে জেলা গভর্নর লায়ন মো. মোছলেহ উদ্দিন আহমেদ অপু পিএমজেএফ, ১ম ভাইস জেলা গভর্নর লায়ন মো. কামরুজ্জামান লিটন এমজেএফ এবং ২য় ভাইস জেলা গভর্নর লায়ন মো. আবু বক্কর সিদ্দিকী পিএমজেএফ এর নেতৃত্বে ২০২৫-২৬ সেবাবর্ষের একটি সফল, সুশৃঙ্খল ও প্রাণবন্ত সমাপ্তির বার্তা সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে।
তাঁদের সম্মিলিত নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা এবং অবিরাম পরিশ্রমের ফলেই জেলা ৩১৫-বি৪-এর লায়নিজম আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। একইসঙ্গে ২০২৬-২৭ সেবাবর্ষের নবনির্বাচিত জেলা নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ও প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হবে, তাঁদের নেতৃত্বে লায়ন্স আন্দোলন মানবসেবা, ঐক্য ও উন্নয়নের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব বিকাশের পথ আরও সুগম ও সুসংগঠিত হবে।
সমাজ পরিবর্তনে লায়নিজমের গুরুত্ব:
বর্তমান বিশ্বে সামাজিক বৈষম্য, পরিবেশ বিপর্যয়, নৈতিক অবক্ষয় এবং মানবিক সংকট ক্রমশ বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় লায়ন্স আন্দোলনের মতো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠনগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। লায়নিজম শুধু সেবামূলক কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষে মানুষে বন্ধন তৈরি করে, নেতৃত্বের বিকাশ ঘটায় এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে। একজন লায়ন্স সদস্য শুধু একজন স্বেচ্ছাসেবক নন, বরং তিনি মানবতার একজন দূত।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল মানবতার কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও এই আন্দোলন সমাজ উন্নয়ন ও মানবসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
বিশেষ করে লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল, জেলা ৩১৫-বি৪, বাংলাদেশ এর ধারাবাহিক কার্যক্রম প্রমাণ করে; সদিচ্ছা, ঐক্য ও সেবার মানসিকতা থাকলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। ২৯তম জেলা কনভেনশন ২০২৬ সেই অঙ্গীকারকেই আরও শক্তিশালী করেছে। মানবতার সেবায়, সম্প্রীতির বন্ধনে এবং সুন্দর সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে লায়ন্স আন্দোলন ভবিষ্যতেও এগিয়ে যাবে, এমনটাই প্রত্যাশা সকলের। “We Serve” শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি মানবতার প্রতি এক চিরন্তন অঙ্গীকার। লায়নিজম দীর্ঘজীবী হোক, দীর্ঘজীবী হোক বাংলাদেশ।
লেখক পরিচিতি : কলাম লেখক ও সংগঠক; সেক্রেটারী, লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং কর্ণফুলী এলিট।
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন