কমল চক্রবর্তী: শ্রমজীবী ও কর্মজীবি মানুষদের কাজের স্বার্থে এবং বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারনে শহরে বাস করতে হয়। তাই তাদের মানাসই একটা বাসার দরকার পরে। কিন্তু সাধ্য ও সামর্থ্যের মধ্যে বাসা পাওয়া অনেক কষ্টের। এরমধ্যে বাড়িয়ালাদের ইচ্ছেমাফিক ভাড়া নির্ধারন ও বছর না ঘুরতেই বাড়িভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া, বাড়ির মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী ভাড়াটিয়াকে বিনা নোটিশে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা, ভাড়া নেওয়ার সময় করা চুক্তির শর্ত না মানাসহ আছে নানা হয়রানি। এক্ষেত্রে ভাড়াটিয়ার বাড়ি ভাড়া আইন নিয়ে অজ্ঞতা ও সচেতনত না থাকায় সুযোগ নিচ্ছে বাড়িয়ালা।
কিছু কিছু বাড়িয়ালা বাসায় মেহমান আসতে পারবেনা , ছেলে মেয়ে কয়জন এসব জিজ্ঞেস করে বাসাভাড়া দেয়। অনেকে বাসায় মেহমান আসলে পানি বন্ধ করে দেয় এবং বাজে ব্যবহার করে। আর ভাড়াটিয়াকে এসব হজম করতে হয়। মোটকথা নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চ-মধ্যবিত্ত সবাই বাড়ি ভাড়ার এ পাগলা ঘোড়ার কাছে অসহায়। কোথাও কোনো জবাবদিহিতা নেই।
কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে বছর ঘুরতেই বাড়িয়ে দিচ্ছে ইচ্ছে মাফিক ভাড়া। ভাড়াটিয়ার কোন কথাই শুনতে রাজিনা বাড়িয়ালা। তাদের ছাপ জবাব না পুসলে বাসা ছেড়ে দিন। তাই অনেকে বাধ্য হয়ে বাসা ছেড়ে দেয় আবার অনেকে বাড়তি ভাড়ার মাসুল গুনে। মাস শেষে কিংবা বছর শেষে দেখা যায় বাসা খোঁজার হিড়িক। আবার দেখা যায় বাসা পালটানোর দৃশ্য। শহরে জীবন যেন এক যাযাবর জীবন।
চট্টগ্রাম জীবিকার পাশাপাশি নিজের কিংবা ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে মাথার নিচে ছাদের সংস্হান করতে বাধ্য হয়ে থাকতে হয় ভাড়াবাড়িতে। সেখানেও থাকে নানা বিপত্তি। পছন্দের এলাকা, আর পছন্দের বাসা মেলাটা কমবেশি সবার জন্যই কঠিন কাজ। কারণ এর সঙ্গে থাকে সামর্থে্যর বিষয়টাও। অসংখ্য মানুষ এভাবে পারা না পারার আক্ষেপ নিয়েই বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছেন নগরীতে। এভাবে নানা সীমাবদ্ধতা ও জটিলতা নিয়ে এবং আয়ের সিংহভাগ ব্যয় করেও জীবন কতটা স্বচ্ছন্দ্য সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কয়েক বছর আগের জরিপের হিসাব অনুযায়ী আমাদের দেশের শতকরা ২৮ ভাগ মানুষ ভাড়া বাসায় থাকেন। এর মধ্যে গ্রামাঞ্চলে সবচেয়ে কম। মাত্র তিন ভাগ। তবে শহরাঞ্চলে বিশেষ করে চট্টগ্রাম এর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যার হিসাবে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ ভাগ লোক ভাড়াবাসায় থাকেন। কোনো বিকল্প না থাকায় এটাই একমাত্র উপায় তাদের জন্য। অন্য এক জরিপ বলছে, গত ২৫ বছরে চট্টগ্রামে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ২০০ শতাংশ। অথচ একই সময়ে বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। অর্থাত্ নিত্যপণ্যের দামের তুলনায় বাড়িভাড়া বৃদ্ধির হার প্রায় দ্বিগুণ। অথচ নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি বারবার সামনে আসলেও বাড়িভাড়া বৃদ্ধির খবর সেভাবে সামনে আসে না। বরং আড়ালে থেকে যায় বারবার। কিন্তু বাস্তবতা হলো এটা সাধারণ মানুষের জন্য সত্যিই অস্বস্তির। এই বিষয়টি নিয়ে কেউ সেভাবে কথা বলতেও আগ্রহী নয়। অথচ যারা ভাড়া বাসায় থাকেন প্রত্যেকে এর ভুক্তভোগী। এর জন্য বিভিন্ন সময়ে তাদের পড়তে হয় নানা বিড়ম্বনার। অথচ এমন নানা বিড়ম্বনাকে সঙ্গী করে তারা চালিয়ে যাচ্ছেন জীবনযাত্রা।
সহজ কথায় ভাড়াবাড়িতে থাকা মানেই নানা দিকের বিড়ম্বনা। কিন্তু বাস্তবতার প্রয়োজনে নানা বিড়ম্বনাকে সঙ্গী করে থাকছে নগরবাসী। এসব বিড়ম্বনার মধ্যে রয়েছে বছর না ঘুরতেই বাড়িভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া, বাড়ির মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী ভাড়াটিয়াকে বিনা নোটিশে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা, ভাড়া নেওয়ার সময় করা চুক্তির শর্ত না মানাসহ আছে নানা হয়রানি। অথচ ভাড়াটিয়াদের অজ্ঞতাকে এক্ষেত্রে খানিক দায়ী করা যেতে পারে। কারণ তারা অবগত নন, ‘বাড়ি ভাড়া দেওয়া এবং নেওয়া সংক্রান্ত একটি আইন আছে দেশে। এমনকি বাড়িওয়ালারা হয় ওয়াকিবহাল নয়, না হয় থোড়াই কেয়ার করেন। ‘বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১’ নামের এই আইন সম্পর্কে অজ্ঞতায় স্পষ্ট হয় উভয় পক্ষের সচেতনতার অভাব। ইচ্ছে করে অমান্যের দলটাও কম ভারী নয়। আর এই না জানার সুযোগটাই নিচ্ছেন বাড়িওয়ালারা।
‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১’-এর আলোচনার পূর্বে এখানে একটু জেনে রাখা দরকার বাড়িভাড়া-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ প্রথম জারি করা হয় ১৯৬৩ সালে। এরপর বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন করা হয় ১৯৯১ সালে । ১৯৯১ সালের এই আইনে সুনির্দিষ্ট বেশ কিছু বিষয় রয়েছে বাড়িভাড়া দেওয়া এবং নেওয়ার ক্ষেত্রে। যেমন—আইন অনুযায়ী বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে একটি লিখিত চুক্তিনামা থাকতে হবে। যেখানে উভয় পক্ষের স্বাক্ষর থাকবে। আর সেই লিখিত চুক্তিতে উল্লেখ থাকবে—চুক্তিনামায় ভাড়ার মেয়াদ, বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ার নাম, ঠিকানা, মোবাইল ফোন নম্বর, ভাড়ার পরিমাণ, বিদু্যত্ বিল, পানির বিল, গ্যাস বিলসহ অন্যান্য আরো নানা প্রয়োজনীয় বিষয়। এবং এখানে স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে বিদু্যত্ বিল, পানির বিল ও গ্যাস বিল কে পরিশোধ করবে। এছাড়া বাড়ির অবস্হান ও সৌন্দর্যের ওপর নির্ভর করে কত জামানত হবে সেটাও এই লিখিত চুক্তিনামায় উল্লেখ থাকতে হবে। আর এই চুক্তিনামা অবশ্যই দলিল হিসেবে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে করতে হবে। কিন্তু এমন আইন মেনে কত জন বাড়িভাড়া দেন বা নেন সেটা বলা মুশকিল। তবে সংখ্যাটা যে হাতে গোনা যাবে, তা অন্তত বলা যায়।
এখানে আরো কিছু নিয়ম বা আইন রয়েছে, যা হয়তো আমরা জানি না। বিষয়টি ভাড়া পরিশোধসংক্রান্ত। আমরা সাধারণত সরাসরি বাড়িওয়ালার হাতে ভাড়া দিয়ে দিই। এর বিনিময়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোনো রসিদ দেওয়া হয় না। কখনো আবার রশিদ দেওয়া হলেও সেখানে ভাড়ার পরিমাণ উল্লেখ থাকে না। অথচ, ‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১’ অনুযায়ী এক্ষেত্রে রশিদ বাধ্যতামূলক। কিন্তু অজ্ঞতার কারণে আমরা এটা করি না। এছাড়া প্রতিনিয়ত আরো একটি সমস্যার সম্মুখীন আমরা হয়ে থাকি; আর হলো ভাড়া বৃদ্ধি। বাড়ির মালিক নানা অজুহাতে তার ইচ্ছেমতো ভাড়া বৃদ্ধি করেন। যার শিকার চট্টগ্রাম শহরের প্রায় প্রত্যেক ভাড়াটিয়া।
বিশেষ করে নতুন বছরের শুরুতে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আইনে স্পষ্ট রয়েছে বাড়িওয়ালা চাইলেই ভাড়া বাড়াতে পারেন না। সাধারণত দুই বছরের কম সময়ে বাড়িভাড়া বাড়ানো যাবে না। এই সময়ের পর বাড়াতে হলে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে আপসে নির্ধারিত হবে। এ ভাড়া নিয়ন্ত্রকও নির্ধারণ করে দিতে পারেন। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অগ্রিম নেওয়া। ১৯৯১-এর ১০ ও ২৩ ধারা মোতাবেক বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রকের লিখিত আদেশ ছাড়া অন্য কোনোভাবেই বাড়ির মালিক তার ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে অগ্রিম বাবদ এক মাসের বাড়িভাড়ার অধিক কোনো প্রকার ভাড়া, জামানত গ্রহণ করতে পারবেন না।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিছু কিছু মেরামতের কাজ বাড়িওয়ালা করতে চান না। বাড়িওয়ালা চাইলেই ভাড়াটিয়াকে অন্যায়ভাবে বাসা থেকে বের করে দিতে পারেন না। এটাও চুক্তিনামার মধ্যে উল্লেখ থাকতে হবে। বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া উভয়কে বাসা ছাড়ার কমপক্ষে দুই মাস আগে জানাতে হবে। এক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ; সেটা হলো, চুক্তিনামা নবায়ন। মেয়াদ শেষে সেটা করা বাধ্যতামূলক। ‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১’ অনুযায়ী ২৫ হাজার টাকার বেশি ভাড়া হলে তা ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কি নতুন করে বাড়ির তালিকা করেছে? এবং কিসের ভিত্তিতে হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ করছে? এক্ষেত্রে আইনের কি সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে? সঠিক ভাবে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে?
সামগ্রিক দিক বিবেচনায় মাস শেষে বাড়িভাড়া মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বোঝা। আয়ের সিংহভাগ ব্যয় হচ্ছে বাসাভাড়া গুনতে। বছর শেষে আয় না বাড়লেও বাড়িয়ালা বাড়িভাড়া বাড়ানোর খড়গ দার করাচ্ছে। বাড়িভাড়া গুনতেই দিশেহারা অবস্থা মধ্যবিত্ত মানুষের। বাড়িভাড়া নিয়ে যে নৈরাজ্য তার জন্য ভাড়াটিয়ার সচেতনতার অভাব ও অজ্ঞতাকে দ্বায়ী করা যায়। এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গুলোর উদাসীনতা ও যথাযত তদারকি না থাকার কারনেও বাড়িয়ালাগুলো সুযোগ নিচ্ছে। বাড়িয়ালা কতৃক অন্যায়ের শিকার হলে ভাড়াটিয়া কার কাছে প্রতিকার চাইবে এই বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা নেই। তাছাড়া বাড়িয়ালার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে ভাড়াটিয়া কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্যে ও নিরাপদে থাকতে পারছে তাও বিবেচ্য বিষয়। সবমিলিয়ে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের সঠিক বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

আইনে বাড়ির ভাড়া মানসম্মতভাবে নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। মানসম্মত ভাড়া সম্পর্কে এই আইনের ১৫ (১) ধারায় বলা হয়েছে, ভাড়ার বার্ষিক পরিমাণ সংশ্লিষ্ট বাড়ির বাজার মূল্যের শতকরা ১৫ ভাগের বেশি হবেনা। বাড়ির বাজার মূল্য নির্ধারণ করার পদ্ধতি ও বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ১৯৬৪তে স্পষ্ট করে উল্লেখ আছে।
আইনানুযায়ী দুই বছরের আগে বাড়ির ভাড়া বাড়ানো যাবে না। কোনো বিরোধ দেখা দিলে বাড়ির মালিক বা ভাড়াটের দরখাস্তের ভিত্তিতে দুই বছর পর পর নিয়ন্ত্রক মানসম্মত ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করতে পারবেন।
বাড়িওয়ালা যদি মানসম্মত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া ভাড়াটের কাছ থেকে আদায় করেন, তাহলে প্রথমবার অপরাধের জন্য মানসম্মত ভাড়ার অতিরিক্ত আদায়কৃত টাকার দ্বিগুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং পরবর্তী প্রতিবার অপরাধের জন্য ওই অতিরিক্ত টাকার তিনগুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
এই আইনের ১৮নং ধারায় উল্লেখ রয়েছে যে, ১৮৮২ সনের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন বা ১৮৭২ সালের চুক্তি আইনের বিধানে যাই থাকুক না কেন, ভাড়াটিয়া যদি নিয়মিতভাবে ভাড়া পরিশোধ করতে থাকেন এবং বাড়িভাড়ার শর্তসমূহ মেনে চলেন তাহলে যতদিন ভাড়াটিয়া এভাবে করতে থাকবেন ততদিন পর্যন্ত উক্ত ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করা যাবে না।
এমনকি ১৮(২) ধারা মতে বাড়ির মালিক পরিবর্তিত হলেও ভাড়াটিয়া যদি আইনসম্মত ভাড়া প্রদানে রাজি থাকেন তবে তাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না। চুক্তিপত্র না থাকলে যদি কোনো ভাড়াটে প্রতিমাসের ভাড়া পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে পরিশোধ করেন, তাহলেও ভাড়াটেকে উচ্ছেদ করা যাবে না।
যুক্তিসংগত কারণে ভাড়াটেকে উচ্ছেদ করতে চাইলে যদি মাসিক ভাড়ায় কেউ থাকে, সেক্ষেত্রে ১৫ দিন আগে নোটিশ দিতে হবে। চুক্তি যদি বার্ষিক ইজারা হয় বা শিল্পকারখানা হয়, তবে ছয়মাস আগে নোটিশ দিতে হবে।
কোনো ব্যক্তি ভাড়ার অতিরিক্ত প্রিমিয়াম, সালামি বা জামানত ভাড়াটেকে দেওয়ার জন্য বলতে পারবেন না। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এর ১০ ও ২৩ ধারা মোতাবেক বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রকের লিখিত আদেশ ছাড়া অন্য কোনোভাবেই বাড়ি মালিক তার ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে অগ্রিমবাবদ এক মাসের বাড়িভাড়ার অধিক কোনো প্রকার ভাড়া, জামানত, প্রিমিয়াম বা সেলামি গ্রহণ করতে পারবেন না। তাহলে দণ্ডবিধি ২৩ ধারা মোতাবেক তিনি দণ্ডিত হবেন।
এই আইনে বাড়ির মালিককে ভাড়ার রসিদ প্রদানের কথা বলা হয়েছে। এ রসিদ সম্পন্ন করার দায়দায়িত্ব বাড়িওয়ালার। রসিদ প্রদানে ব্যর্থ হলে ভাড়াটের অভিযোগের ভিত্তিতে বাড়িওয়ালা আদায়কৃত টাকার দ্বিগুণ অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
এছাড়া কোনো কারণে ভাড়াটিয়ার ভাড়া নেওয়া অংশ মেরামত করার প্রয়োজন হলে বাড়িওয়ালাকে তা মেরামতের নির্দেশ দিতে পারেন এবং মেরামতের খরচ বাড়িওয়ালাকেই বহন করতে হবে। জরুরি মেরামতের ক্ষেত্রে নোটিশ পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মেরামতের ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে ভাড়াটিয়া তার নিজ উদ্যোগে মেরামত করতে পারবেন এবং যাবতীয় খরচ ভাড়া থেকে কেটে রাখতে পারবেন।
ভাড়াটে হিসেবে আপনার/আমার অধিকার এই আইনে লেখা আছে। এই অধিকার কোনো বাড়িওয়ালা লঙ্ঘন করলে তাকে পেতে হবে শাস্তি।
আপনাকে ভাড়াটিয়া হিসাবে যা করতে হবে:
১. মানিঅর্ডারযোগে প্রেরণ করা ভাড়ার টাকা বাড়িওয়ালা যদি গ্রহণ না করেন, পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে ভাড়াটিয়াকে সিনিয়র সহকারী জজের বরাবর দরখাস্ত এবং একইসঙ্গে ভাড়ার টাকাও জমা দিতে হবে।
২. একজন আইনজীবীর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক বরাবর আবেদন করতে হবে।
৩. ভাড়া নিয়ন্ত্রক প্রাথমিকভাবে শুনানির পর যদি সন্তুষ্ট হন যে ভাড়া প্রদানের জন্য অনুমতি দেয়া যাবে, সেক্ষেত্রে ভাড়ার টাকা প্রতিমাসেই আদালতে জমা দেয়া যাবে।
৪. আদালতে ভাড়ার টাকা জমা দিলে আইনতভাবে ভাড়াটিয়াকে ভাড়াখেলাপি বলার সুযোগ থাকবে না।
৫. বাড়িওয়ালার সঙ্গে লিখিত চুক্তিতে কী কী শর্তে ভাড়া দেয়া হলো এবং করণীয় কী, সেসব নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। চুক্তিপত্রে ভাড়া বাড়ানো, অগ্রিম জমা ও কখন বাড়ি ছাড়বেন তা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে।
৬. আর প্রতিমাসে বাড়িওয়ালার কাছ থেকে ভাড়ার লিখিত রসিদ সংগ্রহ করতে হবে।
বাড়িভাড়া আইন অনুযায়ী বাড়ির মালিক তার বাড়িটি বসবাসের উপযোগী করে রাখতে আইনত বাধ্য। বাড়ির মালিক ইচ্ছা করলেই ভাড়াটিয়াকে বসবাসের অনুপযোগী বা অযোগ্য অবস্থায় রাখতে পারেন না। স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বসবাসের উপযোগী করে বাড়িটি প্রস্তুত রাখতে বাড়ির মালিকের উপর এই বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ২১ নং ধারায় বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে।
অর্থাৎ ভাড়াটিয়াকে পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পয়ঃপ্রণালী নিষ্কাশন ইত্যাদি সুবিধা প্রদান করতে হবে। এমনকি প্রয়োজনবোধে লিফটের সুবিধাও দিতে হবে। কিন্তু উক্তরূপ সুবিধা প্রদানে বাড়িমালিক অনীহা প্রকাশ করলে কিংবা বাড়িটি মেরামতের প্রয়োজন হলেও ভাড়াটিয়া নিয়ন্ত্রকের কাছে দরখাস্ত করতে পারবেন।
বাড়ির মালিক ন্যায়সংগত কারণ ছাড়াই ভাড়াটিয়াকে বাড়ি ছেড়ে দিতে বলতে পারবেন না। অনেকক্ষেত্রে বাড়ির মালিক ভাড়া নিতে চান না। এক্ষেত্রে চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বা যদি চুক্তি না থাকে সেক্ষেত্রে মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে মানিঅর্ডার এর মাধ্যমে বাড়ির মালিকের ঠিকানায় ভাড়া পাঠাতে হবে। বাড়ির মালিক যদি ভাড়ার টাকা গ্রহণ না করে সেক্ষেত্রে টাকা ফেরত আসার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে ভাড়াটেকে ভাড়া নিয়ন্ত্রক, অর্থাৎ সহকারী জজের কাছে আইনজীবীর মাধমে দরখাস্ত দিতে হবে। আদালত অনুমোদন দিলে প্রতিমাসে ভাড়া আদালতে জমা দেওয়া যাবে।
তবে বাড়িওয়ালারও বাড়িভাড়া আইনে কিছু অধিকার রয়েছে। যদি ভাড়াটিয়া প্রতিমাসে নিয়মিতভাবে ভাড়া পরিশোধ না করেন তবে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১০৬ এবং ১০৮ (গ) উপ-ধারা অনুযায়ী উচ্ছেদের নোটিশ দিয়ে ভাড়াটিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করা যায়। যৌক্তিকতার নিরূপণে প্রতি দুই বছর পর পর মানসম্মতভাবে ভাড়া বাড়াতে পারেন।
এছাড়াও বাড়ির মালিকের অনুমোদন ব্যতিত যদি সাবলেট কিংবা বাড়ির গঠনগত কোনো বড় পরিবর্তন কিংবা পার্শ্ববর্তী বাড়ির দখলকারী কোনো ব্যক্তিবর্গকে যদি উৎপাত, উত্যক্ত বা বিরক্ত করে থাকলে ভাড়াটিয়ার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন।
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন