ছায়েদ ছাদিন; নারী নির্যাতন বাংলাদেশের একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা। বেইজিং ঘোষণা অনুযায়ী, নারী নির্যাতন হলো এমন যেকোনো কাজ বা আচরণ, যা নারীর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি সাধন করে, তাকে হুমকি দেয়, বা তার স্বাধীনতাকে খর্ব করে। যদিও এ সমস্যার বিরুদ্ধে আন্দোলন ও সচেতনতা বাড়ছে, তবু সাম্প্রতিক একটি জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৮০ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে সহিংসতার শিকার হন। এর মধ্যে ৭২ শতাংশ নারী এই ঘটনা প্রকাশ করেন না। সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ, এবং প্রাসঙ্গিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে অধিকাংশ নারী নীরব থাকেন।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নানা পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক বাধায় নারী যেমন ঘরের বাইরে পদে পদে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পেশাগত বৈষম্য, কর্মস্থলে নিপীড়ন, যৌন হয়রানি ও লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছে; ঠিক তেমনি ঘরের ভেতরও পারিবারিক বঞ্চনা, অবমাননা ও অত্যাচারের শিকার হচ্ছে। হাতেগোনা কয়েকজন বাদে প্রায় প্রত্যেক নারীই কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অনেকে আবার পরিবারের কোনো না কোনো সদস্য দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে। কেউ এটা স্বীকার করেন, কেউ করেন না।মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশের ৩০-৫০ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার।
মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ৪১ দশমিক ৭০ এবং শহরাঞ্চলে ৩৯ দশমিক ৭০ শতাংশ নারী স্বামীর ঘরে নির্যাতনের শিকার হয়।নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নানা আইন আছে; কিন্তু শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব নয়। নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন নারীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। পাশাপাশি প্রয়োজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। নারীকে নারী হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে।
নারী নির্যাতনের প্রধান কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি সমাজের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জন্ম নেয়। যুগ যুগ ধরে নারীদের দুর্বল ও নির্ভরশীল হিসেবে দেখা হয়েছে। শিক্ষার অভাব, দারিদ্র্য, এবং সঠিক পারিবারিক মূল্যবোধের ঘাটতি এই সমস্যাকে আরও গভীর করেছে।
নারী নির্যাতনের প্রভাব শুধু ব্যক্তি বা পরিবার নয়, বরং পুরো সমাজের উপর পড়ে। এটি নারীর সম্ভাবনা এবং সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করে। ফলে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতায়ন ছাড়া একটি ন্যায়সংগত এবং সমৃদ্ধ সমাজ গঠন সম্ভব নয়।
১২ ধরনের সহিংসতার শিকার হয় নারীরাঃ
একশনএইডের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইনে নারীর প্রতি ১২ ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে নারীরা অশ্লীল, ক্ষতিকর, যৌনতামূলক ও বিদ্বেষমূলক মন্তব্য পেয়ে থাকেন। ৫৩ শতাংশ নারীকে ইনবক্সে অশ্লীল ছবি পাঠিয়ে যৌন সম্পর্ক করার কথা বলে হয়রানি করা হয়। বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হন ১৯ শতাংশ নারী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের নাম ব্যবহার করে ভুয়া আইডি খোলার মাধ্যমে সহিংসতার শিকার হয়েছেন প্রায় ১৮ শতাংশ নারী। ১৬ শতাংশ নারী বলেছেন, সাইবার জগতে তাঁদের কর্মকাণ্ড সব সময় অনুসরণ করা হচ্ছে। সমকামিতার পক্ষে কথা বলায় ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হয়েছেন ১৩ শতাংশ।
এ ছাড়া অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া (পোস্ট), যৌন সহিংসতা করার হুমকি, ফেসবুক লাইভ বা শিক্ষামূলক অধিবেশন চলার সময়ে যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্য, কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলার চাপ, যৌন সহিংসতা ঘটানোর সময় ছবি তুলে ও ভিডিও করে পরে পোস্ট করা এবং নাটক–সিনেমায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলে প্রতারণা করা হয়েছে নারীদের সঙ্গে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি সহিংসতার সম্মুখীন হয়েছেন নারীরা, এ হার ৪৭ শতাংশ। মেসেঞ্জারে হারটি ৩৫ শতাংশ। এ ছাড়া ইনস্টাগ্রাম, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউবসহ অন্যান্য মাধ্যমেও সহিংসতার মুখে পড়েছেন নারীরা।
এ সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ:
১। শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি: প্রতিটি নারীকে তার অধিকার এবং সুরক্ষার বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
২। আইনের কঠোর প্রয়োগ: নারী নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তি নিশ্চিত করতে আইনি ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হবে।
৩। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা: কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
৪। পারিবারিক মূল্যবোধ গঠন: পরিবার থেকে নারীর মর্যাদা ও সুরক্ষার শিক্ষা দিতে হবে।
৫। সামাজিক আন্দোলন: গণসচেতনতা বাড়ানোর জন্য গণমাধ্যম এবং সামাজিক প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগাতে হবে।
বাংলাদেশে নারী নির্যাতন বন্ধে সরকার, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নারী শুধু পরিবারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তারা সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের শক্তি। তাই নারী নির্যাতন বন্ধের মাধ্যমে একটি সমতাভিত্তিক ও সুরক্ষিত সমাজ গড়ে তোলা আমাদের সবার দায়িত্ব।পরিবর্তন এখনই প্রয়োজন।
লেখকঃ
ছায়েদ ছাদিন;ইয়ুথ(একশন ফর ইয়ুথ ক্লাব,ব্রাইট বাংলাদেশ ফোরাম,
একশনএইড বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম)
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন