রিদুয়ানুল হাকীম রিয়াদ:
চট্টগ্রাম আজ বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়িত শহরগুলোর একটি। কিন্তু এই উন্নয়নের গল্পের ভেতরে একটি নীরব সংকট তৈরি হচ্ছে—যুবদের অংশগ্রহণের ধরন, এনজিও সেক্টরের ব্যবহারিক কাঠামো, এবং টেকসই পরিবর্তনের অভাব। এই বিষয়টি বোঝার জন্য শুধু অভিজ্ঞতা নয়, পরিসংখ্যান ও বাস্তব চিত্র একসাথে দেখা জরুরি।
বাংলাদেশে বর্তমানে কয়েক হাজার এনজিও সক্রিয়—একটি গবেষণা অনুযায়ী ৬,৫০০-এর বেশি এনজিও ও তাদের শাখা কার্যক্রম পরিচালনা করছে , আর সামগ্রিকভাবে ৪,০০০-এর বেশি নিবন্ধিত সংগঠন সামাজিক উন্নয়নে কাজ করছে । এই বিশাল সেক্টর দেশের দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এই সেক্টরের শীর্ষে রয়েছে BRAC—যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সংস্থাগুলোর একটি। তাদের প্রায় ৯০,০০০-এর বেশি কর্মী রয়েছে এবং তারা ১২ কোটিরও বেশি মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেয় । একইভাবে Save the Children বাংলাদেশে ১৯৭০-এর দশক থেকে কাজ করছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে শুধু একটি সংকটকালেই ২৩ লাখ মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিয়েছে ।
যুব সম্পৃক্ততার দিক থেকে JAAGO Foundation-এর মতো সংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ—তাদের ৬০,০০০-এর বেশি ভলান্টিয়ার রয়েছে এবং ৫০,০০০-এর বেশি যুব “Volunteer for Bangladesh” প্ল্যাটফর্মে যুক্ত । আবার BD Clean-এর মতো উদ্যোগে ৫৮,০০০+ তরুণ সরাসরি মাঠপর্যায়ে কাজ করছে । এই সংখ্যা প্রমাণ করে—যুবরা অংশ নিতে চায়, সুযোগ পেলে তারা এগিয়ে আসে।
চট্টগ্রামকেন্দ্রিক বা স্থানীয় পর্যায়ের সংগঠন যেমন Bright Bangladesh Forum (BBF), BITA, YPSA (ইপসা), এবং অন্যান্য আঞ্চলিক এনজিওগুলোও যুব উন্নয়ন, স্কিল ডেভেলপমেন্ট ও সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে কাজ করছে। তবে বাস্তব চ্যালেঞ্জ এখানেই—এই বিপুল সংখ্যক যুব সম্পৃক্ততা কি সত্যিই “ইমপ্যাক্ট” তৈরি করছে?
সমস্যার জায়গাটা কাঠামোগত।
প্রথমত, ইভেন্ট-সেন্ট্রিক এনগেজমেন্ট:
বর্তমানে অনেক এনজিও প্রকল্পভিত্তিক কার্যক্রমে যুবদের যুক্ত করে। একটি ট্রেনিং, একটি ডায়ালগ, একটি ক্যাম্পেইন—এরপর সংযোগ বিচ্ছিন্ন। ধারাবাহিক লিডারশিপ বা মুভমেন্ট তৈরি হয় না। ফলে যুবরা “অংশগ্রহণকারী” হয়ে থাকে, “পরিবর্তনের চালক” হয় না।
দ্বিতীয়ত, রিসোর্স বনাম রিপ্রেজেন্টেশন সংকট:
যুবদেরকে প্রায়ই “ফেস” হিসেবে ব্যবহার করা হয়—রিপোর্ট, ছবি, বা ডোনার ভিজিবিলিটির জন্য। কিন্তু নীতি নির্ধারণ, প্রকল্প ডিজাইন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ সীমিত। এতে করে তাদের সক্ষমতা অপচয় হয়।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বিচ্ছিন্নতা:
বাংলাদেশে যুবদের একটি বড় অংশ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। উদাহরণ হিসেবে, পথশিশুর সংখ্যা ১৫-১৬ লাখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা —যা নগর দরিদ্রতার গভীরতা নির্দেশ করে। চট্টগ্রামের মতো শহরে শিল্পখাতে সংকট, গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি—এই বাস্তবতায় যুবরা উন্নয়ন সেক্টরে এলেও দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার বা প্রভাব তৈরি করতে পারছে না।
চতুর্থত, নীতিনির্ধারণী দূরত্ব:
নীতিনির্ধারকরা এখনো যুবদেরকে একটি “বেনিফিশিয়ারি গ্রুপ” হিসেবে দেখে, “পার্টনার” হিসেবে নয়। অথচ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনে যুবদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
কী করা প্রয়োজন?
১. এনজিওগুলোকে যুবদের “প্রজেক্ট পার্টিসিপেন্ট” নয়, “চেঞ্জ এজেন্ট” হিসেবে দেখতে হবে
২. দীর্ঘমেয়াদি লিডারশিপ ট্র্যাক তৈরি করতে হবে (১–৩ বছরের এনগেজমেন্ট মডেল)
৩. স্থানীয় (চট্টগ্রামভিত্তিক) যুব নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে হবে
৪. স্কিল + ইনকাম + অ্যাক্টিভিজম—এই তিনটাকে একসাথে যুক্ত করতে হবে
৫. নীতিনির্ধারণে যুব প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে
চট্টগ্রামের যুবরা সংখ্যায় বিশাল, সম্ভাবনায় আরও বড়। কিন্তু এই সম্ভাবনা যদি শুধু ইভেন্ট, সেলফি আর সার্টিফিকেটে আটকে যায়—তাহলে উন্নয়ন সেক্টর নিজের শক্তিকেই হারাবে।
এখন সময় একটি কঠিন প্রশ্ন করার—
আমরা কি সত্যিই পরিবর্তন চাই, নাকি শুধু পরিবর্তনের গল্প বলতে চাই?
লেখক: ম্যানেজার, ব্রাইট বাংলাদেশ ফোরাম
ইয়াং ডেভেলপমেন্ট এক্টিভিস্ট।
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন