একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক, তার অন্যতম সূচক হলো সেই রাষ্ট্র কতটা কার্যকরভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের (Persons with Disabilities) অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। বাংলাদেশ সংবিধান সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করলেও বাস্তবতায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এখনও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, বিচার, তথ্যপ্রযুক্তি, স্থানীয় সরকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের প্রতিটি স্তরে নানা ধরনের বৈষম্য ও বঞ্চনার মুখোমুখি হচ্ছেন।বাংলাদেশ ২০০৭ সালে জাতিসংঘের Convention on the Rights of Persons with Disabilities (UNCRPD) অনুসমর্থন করে এবং পরবর্তীতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করে। এই আইন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে প্রতিবন্ধিতা কোনো দয়া, করুণা বা চিকিৎসার বিষয় নয়, বরং এটি একটি মানবাধিকার, সমতা, মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের অধিকাংশ নীতি, কর্মসূচি এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনও অধিকারভিত্তিক নয়, বরং দান-খয়রাত ও চিকিৎসাকেন্দ্রিক ধারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
আমাদের সমাজে এখনও “বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন“, “প্রতিবন্ধী মানুষ” বা আরও অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করা হয়। অথচ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ অনুযায়ী সঠিক পরিভাষা হলো “প্রতিবন্ধী ব্যক্তি“। কারণ তিনি প্রথমে একজন মানুষ, এরপর তার প্রতিবন্ধিতার ধরন। তাই বলতে হবে, শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বাক ও ভাষাগত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তি, অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তি ইত্যাদি। ভাষার এই পরিবর্তন শুধু শব্দের পরিবর্তন নয়, এটি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
বাস্তব চিত্র: পরিসংখ্যান যা আমাদের ভাবায়: বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে এখনও বিভিন্ন উৎসে পার্থক্য রয়েছে। এর প্রধান কারণ নিবন্ধন পদ্ধতি, জরিপের সংজ্ঞা এবং তথ্য সংগ্রহের ভিন্নতা।সমাজসেবা অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় ৩৮.৪ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সরকারি নিবন্ধনের আওতায় এসেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩৪.৫ লাখ ব্যক্তি প্রতিবন্ধী ভাতা এবং প্রায় ৮১ হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষা উপবৃত্তি পাচ্ছেন। এটি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তা উদ্যোগ হলেও নিবন্ধিত ব্যক্তিদের সংখ্যা দেশের প্রকৃত প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না।অন্যদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানাচ্ছে, বিশ্বে প্রতি ৬ জনে ১ জন, অর্থাৎ প্রায় ১৬ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে বসবাস করেন। এই হিসাব বিবেচনায় বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রকৃত সংখ্যা সরকারি নিবন্ধনের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) প্রকাশিত Disability Insights from Labour Force Survey 2022 প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ, শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ এখনও সাধারণ জনগণের তুলনায় অনেক কম। অন্যদিকে UNICEF Bangladesh-এর সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিদ্যমান সেবার বড় অংশ এখনও অপ্রতুল, বিচ্ছিন্ন এবং পর্যাপ্তভাবে প্রবেশগম্য নয়।The MICS( Multiple Indicator Cluster Survey) ২০২৫ অনুযায়ী ২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৫.২ শতাংশ শিশু অন্তত একটি কার্যকরী সীমাবদ্ধতার সঙ্গে বসবাস করছে।এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্ট করে যে প্রতিবন্ধিতা কোনো ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি কেন্দ্রীয় ইস্যু।
আইনে স্বীকৃত ১৩ ধরনের প্রতিবন্ধিতা:
বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ অনুযায়ী বর্তমানে ১৩ ধরনের প্রতিবন্ধিতা স্বীকৃত। এগুলো হলো:
১. শারীরিক প্রতিবন্ধিতা
২. দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা
৩. শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা
৪. বাক ও ভাষাগত প্রতিবন্ধিতা
৫. বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতা
৬. মানসিক অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধিতা
৭. অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার
৮. সেরিব্রাল পালসি
৯. ডাউন সিনড্রোম
১০. বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা
১১. বধির-অন্ধ প্রতিবন্ধিতা
১২. নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধিতা
১৩. অন্যান্য আইনস্বীকৃত প্রতিবন্ধিতা।
কিন্তু বাস্তবে এই ১৩ ধরনের প্রতিবন্ধিতার জন্য পৃথক পরিকল্পনা, পৃথক বাজেট, পৃথক সেবা কাঠামো কিংবা বিশেষায়িত সরকারি ব্যবস্থাপনা প্রায় নেই বললেই চলে।
ভাতা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন অধিকারভিত্তিক অন্তর্ভুক্তি:
সরকারের সুবর্ণ কার্ড, প্রতিবন্ধী ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি এবং কিছু পুনর্বাসন কর্মসূচি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কি কেবল ভাতার জন্য জন্মগ্রহণ করেন?
তিনি কি একজন নাগরিক নন?
কেন একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সাধারণ বিদ্যালয়ে সমানভাবে পড়তে পারবেন না? কেন তিনি সরকারি চাকরিতে যুক্তিসঙ্গত সুযোগ (Reasonable Accommodation) পাবেন না? কেন স্থানীয় সরকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, জলবায়ু পরিকল্পনা, যুব উন্নয়ন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন কিংবা ডিজিটাল সেবায় তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না?
প্রবেশগম্যতা এখনও বড় সংকট:
আজও অধিকাংশ সরকারি ভবনে মানসম্মত র্যাম্প নেই, ব্রেইল সাইনেজ নেই, ট্যাকটাইল পথ নেই, লিফটে অডিও নির্দেশনা নেই, সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ইন্টারপ্রেটার নেই এবং সরকারি ওয়েবসাইটগুলোর বড় অংশ আন্তর্জাতিক ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটি মানদণ্ড অনুসরণ করে না।
আদালত, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি অনেক এনজিওর অফিসও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পূর্ণাঙ্গভাবে প্রবেশগম্য নয়।
সরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও ও আইএনজিওর বাস্তবতা:
বাংলাদেশে প্রতিবন্ধিতা নিয়ে নিয়মিত কাজ করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখনও খুব সীমিত। Humanity & Inclusion (HI), Centre for Disability in Development (CDD), CRP, CSID, CDRC, CRC এবং কিছু স্থানীয় সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু অধিকাংশ উদ্যোগই প্রকল্পভিত্তিক এবং দাতা নির্ভর। প্রকল্প শেষ হলে কার্যক্রমও থেমে যায়।অনেক এনজিও প্রতিবন্ধিতা নিয়ে কাজ করলেও তা মূলধারার উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ নয়। ফলে শিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জীবিকা, যুব উন্নয়ন, নারী অধিকার, স্থানীয় সরকার কিংবা সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ এখনও সীমিত।
Charity Model থেকে Rights-Based Model-এ যেতে হবে
বাংলাদেশে এখনও প্রতিবন্ধিতা নিয়ে কাজের বড় অংশ Charity Model ও Medical Model-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে রোগী বা সহায়তাপ্রার্থী হিসেবে দেখা হয়।
অথচ UNCRPD বলছে, প্রতিবন্ধিতা সৃষ্টি করে ব্যক্তি নয়, বরং সমাজের বৈষম্যমূলক পরিবেশ, অবকাঠামো এবং নীতিমালা। তাই প্রয়োজন Rights-Based Approach, যেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হবেন উন্নয়নের অংশীদার, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার এবং সমঅধিকারসম্পন্ন নাগরিক।
আন্তর্জাতিক দিবসের বাইরে কী হচ্ছে?
প্রতি বছর ৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবসে আলোচনা সভা, র্যালি এবং সেমিনার হয়। কিন্তু বছরের বাকি সময়ে কতগুলো সরকারি দপ্তর প্রতিবন্ধিতা সংবেদনশীলতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়? কতটি ইউনিয়ন পরিষদ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা করে? কতটি বিদ্যালয় অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করে?বাস্তবতা হলো, দিবস পালন হচ্ছে, কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন খুব ধীরগতির।
LAB-CDRC: সময়ের দাবি:
বাংলাদেশে Local Area Based Comprehensive Disability Rehabilitation (LAB-CDRC) মডেলকে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।প্রত্যেক ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ওয়ার্ডে এমন একটি One Stop Community Based Disability Service গড়ে তুলতে হবে, যেখানে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি একই জায়গা থেকে স্বাস্থ্যসেবা, পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, আইনি সহায়তা, সহায়ক উপকরণ, সামাজিক নিরাপত্তা ও সরকারি সেবা পাবেন।এটি সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা বিভাগ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, এনজিও এবং স্থানীয় সিএসওর সমন্বয়ে পরিচালিত হতে পারে।
এখন কী করা প্রয়োজন?
– UNCRPD এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
– প্রতিটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে Disability Inclusion Action Plan প্রণয়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
– সরকারি ও বেসরকারি ভবনে Universal Accessibility এবং Reasonable Accommodation আইনগতভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
– প্রতিবন্ধিতার ১৩টি ধরন অনুযায়ী পৃথক বাজেট, সেবা পরিকল্পনা ও ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে।
– সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক, পুলিশ, বিচার বিভাগ, সাংবাদিক এবং এনজিও কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক Disability Sensitization Training চালু করতে হবে।
– ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে LAB-CDRC ভিত্তিক সমন্বিত সেবা চালু করতে হবে।
– স্থানীয় সরকার, যুব সংগঠন, সিএসও, ধর্মীয় নেতা, স্বেচ্ছাসেবক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করে কমিউনিটি ভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে।
– জাতীয় ও স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, জলবায়ু পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য কমিটি, শিক্ষা কমিটি এবং উন্নয়ন কমিটিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বাধ্যতামূলক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
– এনজিও ও আইএনজিওগুলোকে কেবল প্রকল্পভিত্তিক নয়, মূলধারার প্রতিটি উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রতিবন্ধী অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।
– “Nothing About Us Without Us” নীতি অনুসরণ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো নীতি, পরিকল্পনা বা বাজেট প্রণয়ন করা যাবে না।বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও টেকসই উন্নয়নের রাষ্ট্র গড়তে চায়, তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের করুণার নয়, অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হবে। কারণ একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সমাজের বোঝা নন, তিনি একজন নাগরিক, একজন শিক্ষার্থী, একজন কর্মী, একজন উদ্যোক্তা, একজন ভোটার এবং সর্বোপরি একজন মানুষ।
দান নয়, অধিকার। সহানুভূতি নয়, সমঅধিকার। আলাদা নয়, মূলধারায়। এটাই হোক বাংলাদেশের অঙ্গীকার।
লেখক: রিদুয়ানুল হাকীম রিয়াদ,
ইয়াং ডেভেলপমেন্ট এন্ড হিউম্যান রাইটস এক্টিভিস্ট, চট্টগ্রাম
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন