কমল চক্রবর্তীঃ চট্টগ্রাম নগরীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অসংখ্য অবৈধ ব্যাটারি চালিত রিকশা। শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, গ্রামগঞ্জে এর ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। বিগত এক দশকে এর ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু কেন এর ক্ষতিকর দিক জানার পরও এর যন্ত্রপাতি আমদানি, উৎপাদন ও বাজারজাত করনের সুযোগ দেয়া হয়েছে এবং রাস্তায় নামার সুযোগ দেয়া হয়েছে? আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও কার স্বার্থে এবং কিসের স্বার্থে এদের ব্যাপারে উদাসীন ছিল সংশ্লিষ্ট প্রশাসন? এই প্রশ্নের উত্তর কার কাছে মিলবে? দিনে দিনে যতই বাধাহীন ভাবে এর ব্যাপক উপস্থিতি বেড়েছে ততই বিভিন্ন পেশার মানুষ নিজের পেশা ছেড়ে এই পেশায় যুক্ত হয়েছে। দিনমজুর বা দোকান কর্মচারি, পঙ্গু অসহায় বা এলাকার বেকার কিশোর রাতারাতি বনে গেছে অটোরিকশা চালক। এটি চালানো আরামদায়ক হওয়ায় অনেকেই ঝুঁকেছে এই পেশায়। বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে এসব রিকশা। এসব নিয়ন্ত্রণে এবং নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে নিয়মিত চাঁদার বিনিময়ে গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। এছাড়া পর্দার আড়ালে প্রশাসন, সাংবাদিক নামধারী কিছু লোক, পাড়া মহল্লার নেতা এদের থেকে সুবিধা নেয় ফলে এরা অনেকটাই বেপরোয়া।
অনেক নেশা গ্রস্ত যুবকরাও চালাচ্ছে রিকশা। ১৩/১৪ বছর বয়সী শিশু কিশোরদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে এই যন্ত্রদানবের চাবি। এসব মূলত অলি-গলিতে চলাচল করলেও ৫ আগস্টের পর থেকে পুলিশি ব্যাবস্থার ভঙ্গুরতার সুযোগ নিয়ে দখলে নিয়েছে অলিগলি ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সমূহ। ৫ই আগস্টের পর কোন প্রকারের ট্রাফিক নিয়ম নীতির ধার না ধেরে বেপরোয়া গতিতে নগর জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এই যান। সরকার পরিবর্তনে ট্রাফিক পুলিশের অনুপস্থিতিতে আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে এসবের সংখ্যা। ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা, বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা।
এখন প্রশ্ন হলো কেন শুরুতে এগুলো বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি? আদালতের নির্দেশনা থাকা স্বত্বেও কেন জোড়ালো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি? এখন এগুলো বন্ধ করা হলে এতগুলো চালকের পূর্নবাসন কিভাবে সম্ভব? আর পূর্নবাসন ছাড়া এসব বন্ধে প্রশাসন কতটুকু সফল হবে? রিকশা জব্ধ করা হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায় কিন্তু এখনো কেন এই রিকশার আমদানি, উৎপাদন ও বাজারজাত বন্ধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
কোন প্রকারের রাজস্ববিহীন, লাইসেন্সবিহীন এই যানটিকে অবাধে চলাচলের সুযোগ দেয়া হয়েছে কার স্বার্থে? কেন বছরের পর বছর কোন প্রকারের নীতিমালায় নিয়ে আসা হয়নি? আজকে সারা দেশে ব্যাপক ভাবে ছড়িয়েছে এই রিকশা। এগুলো একদিকে ট্রাফিক সিস্টেম ভেঙ্গে পড়ছে অন্যদিকে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানী ঘটছে।
যাত্রীদের অনেকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ব্যাটারি রিকশার চালকদের বেশীর ভাগেরই আচরণ সন্ত্রাসী স্টাইলের। অনেকেই নেশাগ্রস্ত। এরা ভাড়া নিয়ে সামান্য কথা কাটাকাটি হলে সংঘবদ্ধ হয়ে যাত্রীর উপর আক্রমণ করে এবং আজেবাজে মন্তব্য করে। অনেকেই মান সন্মানের ভয়ে এড়িয়ে যান। মহিলা যাত্রীদেরও নানা ভাবে নাজেহাল করে। এরা রাস্তায় এতো বেপরোয়া যে কোন কিছুকে তোয়াক্কা করে না। অনেকে পঙ্গু না হয়েও পঙ্গুর ভান করে।
সরজমিনে দেখা গেছে, পুলিশের নাকের ডগায় চট্টগ্রাম মহানগর জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। অলিগলি ছেড়ে মূল সড়কে অনেকটা ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ চলছে অযান্ত্রিক এই যান। প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন রিকশার। শহরের প্রতিটি অলিগলি থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক গুলো এই ব্যাটারি চালিত রিকশার দখলে। এই অবৈধ যানের যন্ত্রপাতি আমদানি নিষিদ্ধ না করায় প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে অসংখ্য রিকশা। চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর, নয়াবাজার, ছোটপোল, বড়পোল, আতুড়ার ডিপো, অক্সিজেন মোড়, দেওয়ানহাট, কদমতলী, মাঝিরঘাট, পশ্চিম বাকলিয়া থানাধীন বগারবিল শান্তি নগর, মাস্টারপুল, কালামিয়া বাজার, মিয়াখান নগর, চকবাজার বাদুরতলা, পাহাড়তলী এলাকার আমবাগান, অলংকার মো্ড়, বন্দরটিলা, পতেঙ্গা সহ বেশ কিছু স্থানে রয়েছে অবৈধ ব্যাটারি চালিত রিক্সার গ্যারেজ ও ব্যাটারি চার্জিং স্টেশন। আর এখানেই প্রতিদিন হাজার ব্যাটারি চালিত রিকশার ব্যাটারির চার্জ দেয়া হচ্ছে। এতে একদিকে বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং হচ্ছে অন্যদিকে নগরবাসীর ঝুঁকি বাড়ছে। সড়ক ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। প্রতিনিয়ত ঘটছে নানান দুর্ঘটনা।
চট্টগ্রাম ও ঢাকা মহানগরে চলাচলে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অদৃশ্য কোন এক শক্তির বলে এসব গাড়ি দেদারছে চলছে চট্টগ্রাম মহানগরীতে। আর এ চলাচলকে আরও বেগবান করতে কয়েকটি সংগঠন মিলে গড়ে তুলেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে অবৈধ এসব গাড়ি চলতে দেয়া বাবদ নগরীতে প্রতিদিন চাঁদাবাজি হয় কমপক্ষে ৭০ লাখের অধিক টাকা।
সিএমপি’র একটি সূত্রের বরাতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধে হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। কাজেই নগরীতে এগুলোর চলাচল সম্পূর্ণ অবৈধ ও বেআইনি। অবৈধ ব্যাটারি রিকশার দৌরাত্ম্য বন্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। এক্ষেত্রে আমাদের নির্দেশনা হলো রাস্তায় এই গাড়ি দেখামাত্রই ধরা, জরিমানা করা। তবে এখানে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। জব্দ গাড়িগুলো রাখার মতো আমাদের পর্যাপ্ত জায়গা (ডাম্পিং প্লেস) নেই। ফলে গাড়ি ধরে জরিমানা করে একদিন পর ছেড়ে দেয়া হয়। যেদিন ধরে সেদিনও ছেড়ে দিতে হচ্ছে। যে কারণে মনে হচ্ছে চালকরা রাস্তায় এই অবৈধ গাড়ি নামানোর সাহস পাচ্ছে। যদিও গত সপ্তাহে ব্যাটারি রিকশা থেকে পড়ে এক শিশুর মৃত্যুতে টনক নড়েছে প্রশাসনের । গত কয়েকদিনে আটক করা হয়েছে কয়েক হাজার ব্যাটারি চালিত রিকশা। কিন্তু তাতেই থেমে নেই ব্যাটারি চালিত রিকশার দাপট। অবাধে চলছে এসব অবৈধ যান।
ট্রাফিক পুলিশ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরে অন্তত ৫০ হাজার ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশা রয়েছে। কিন্তু এর সঠিক পরিসংখ্যান কারো কাছে নেই ।
সূত্রমতে, কোনো রকম সরকারি অনুমোদন ও রাজস্ব আদায় ছাড়াই চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। দৈনিক অটোরিকশা প্রতি ১৩০–১৪০ টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও আবার এই চাঁদার পরিমাণ ১৭০–১৮০ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যাটারিচালিত রিকশায় দুই ধরনের ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এর মধ্যে কেউ কেউ ১৩০ ভোল্টের ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যাটারি ব্যবহার করে। আবার কেউ কেউ ২৩০ ভোল্টের ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যাটারি ব্যবহার করে থাকে। এই দুই ধরনের ব্যাটারি চার্জ দিতে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ বিল খরচ হয় ৩০ থেকে ৪০ টাকা। বাকি টাকা গ্যারেজ মালিকের মুনাফা।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অযান্ত্রিক এসব যানবাহন যাত্রী এবং অন্যান্য গাড়ির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এই গাড়ির যে কাঠামোতে তৈরি, এর সঙ্গে গতি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে রাস্তায় হামেশা দুর্ঘটনা ঘটছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হয়। বিদ্যুৎ ঘাটতির সময়ে অবৈধ এই যানবাহন চলতে দেওয়া কোনোভাবেই উচিত হচ্ছে না। এ ছাড়া এই বাহন নিরাপদও নয়। সাধারণ রিকশার অবকাঠামো কিছুটা পরিবর্তন করে তৈরি এসব রিকশা বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। এতে প্রায়ই সড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে।
পুলিশ বলছে এসব যানের অধিকাংশই চালায় অপেশাদার চালকেরা। এদের মধ্যে অনেকেই আছে নেশাগ্রস্ত, উশৃঙ্খল, বেপরোয়া স্বভাবের। দীর্ঘদিন ধরে হ য ব র ল নগরের ট্রাফিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে তৎপরতা শুরু করেছ পুলিশ। তাই সড়কে ধীরে ধীরে হার্ডলাইনে যাচ্ছে তারা।
অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কঠোর হলেও নগরে বাড়ছে এসবের শোরুম। বিক্রিও বেড়েছে কয়েকগুণ। তাই মূল সড়ক নিরাপদ হলেও নগরের অন্যান্য সড়কে এসবের অবাধ বিস্তার যাত্রীদের ঝুঁকিতে ফেলবে। বাড়বে যাতায়াত বিশৃঙ্খলা। তাই এসবের আমদানি বা বিক্রি বন্ধে কঠোর হয়ে বিকল্প নিরাপদ গণপরিবহনে সরকারকে মনযোগী হওয়ার পরামর্শ সচেতন নাগরিকদের।
সূত্রের খবর, নগরীতে এধরণের ৫০ হাজার রিকশা চলাচলকে কেন্দ্র করে পুলিশের নামে বছরে প্রায় আড়াইশ কোটি টাকার চাঁদাবাজি করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। দায়িত্বশীলদের অবহেলায় এই খাত থেকে মোটা অংকের রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। কার্যকর পদক্ষেপ নিলে বছরে অন্তত ৫০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে পারবে বলে অনুসন্ধানে ওঠে এসেছে। তবে এই চাঁদাবাজির সাথে পুলিশ কোনভাবেই জড়িত নয় বলে দাবি করছে সিএমপি। চালকদের হয়রানি ও চাঁদাবাজি মুক্ত রাখতে রাজস্ব আদায়ের দাবি রিকশা মালিক সমিতির। চাঁদাবাজি বন্ধে ও রাজস্ব আদায়ের লক্ষে একটি নীতিমালার আলোকে রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে বৈধতা দেয়ার পরিকল্পনা করছে সিটি কর্পোরেশন।
জানা যায়, কোন রকমের সরকারি অনুমোদন ও রাজস্ব আদায় ছাড়াই চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার ব্যাটারী রিকশা চলাচল করছে। পুলিশ প্রোটেকশনের নাম দিয়ে দৈনিক রিকশাপ্রতি ১৩০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেক চালকই এই জানিয়েছেন। কোথাও কোথাও আবার এই চাঁদার পরিমান ১৮০ টাকা পর্যন্ত নেয়া হয় বলে জানা গেছে। নিয়মিত চাঁদা প্রদানের মাধ্যমে যেসেব মালিক টোকেন সংগ্রহ করে থাকে তারা নিরাপদেই রাস্তায় এসব রিক্সা চালাতে পারে আর যারা টোকেন নেয়না না পুলিশ তাদের আটক করে থাকে। টোকেন থাকলে আর কেউ ডিষ্টার্ব করেনা। টোকেনের উপর ভর করে পুরো শহর দাপিয়ে ব্যাটারি রিকশা চলাচল করছে। আর এসব টোকেন বানিজ্যের সাথে জড়িত রয়েছে নগরের বিভিন্ন এলাকার গ্যারেজ মালিকেরা। ওয়াজিউল্লাহ নামের এক ব্যক্তি বিভিন্ন লোক মারফত রিকশা চালকদের টোকেন প্রদান করেন। এসব টোকেনে লেখা আছে- ‘চট্টগ্রাম ইলেকট্রিক চার্জার রিকশামালিক সমিতির ৫জন প্রতিনিধির দায়ের করা আপিল আবেদন (সিপি আপিল নং- ১৩৭/২০২২) এর পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে ৪ এপ্রিল আপিল বিভাগের দেওয়া সিদ্ধান্তে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে চলাচলরত ইজিবাইক/ইলেকট্রিক চার্জার থ্রি-হুইলার হাইওয়ে ব্যতিত বাদবাকি সব সড়কে চলাচলের বৈধতা অর্জন করেছে।’ নগরের খুলশীসহ বিভিন্ন এলাকায় ‘চট্টগ্রাম ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা মালিক কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে স্টিকার ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চান্দগাঁও থানাধীন মৌলভী বাজার থেকে কালুরঘাট ব্রিজ এবং ওয়াসা রোড, পাঠাইন্না গোদা থেকে হামিদচর, ওসমানিয়াপুল থেকে সিএন্ডবি এর আশেপাশে পুরো এলকা মিলে ১০/১২ হাজার ব্যাটারি রিকশা চলাচল করছে। ওইসব এলাকায় রিকশা নিয়ন্ত্রণ করেন, মো. বেলাল, মহিউদ্দিন, লিটন, ইসমাঈল।
বাকলিয়া থানাধীন এক্সেস রোড, চকবাজার ধুনিরপুল থেকে সৈয়দ শাহ রোড ও বড় কবরস্থান হয়ে পুলিশ বিট, আব্দুল লতিফহাট থেকে চেয়ারম্যানঘাট এবং আন্দরকিল্লা ও টেরিবাজার থেকে কালামিয়া বাজার পর্যন্ত ৫/৬ হাজার ব্যাটারি রিকশা চলাচল করছে। এসব নিয়ন্ত্রণ করছে দেলোয়ার, মনিকা হিজড়া, লাকি হিজড়া, আব্দুল কুদ্দুস, মো. ইসমাঈল, ইব্রাহিম তোহান, শফিক কোম্পানি, হানিফ কোম্পানিসহ ৮-১০ জন গ্যারেজ মালিক।
চকবাজার এলাকার ডিসি রোড, কে.বি আমান আলী রোড, নবাব সিরাজউদ্দৌলা রোড এবং এক্সেস রোডে চলাচল করে কয়েক হাজার ব্যাটারি রিকশা। খুলশী থানাধীন জালালাবাদ থেকে ওয়্যারলেস হয়ে সেগুনবাগান রেলস্কুল ও মামা-ভাগিনার মাজার পর্যন্ত, বিজিএমইএ ভবনের সামনে থেকে ঝাউতলা বাজার হয়ে আমবাগান রেলগেইট ও সাউদার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে থেকে পলিটেকনিক মোড় পর্যন্ত ৪/৫ হাজার ব্যাটারি রিকশা চলাচল করছে। ওই এলাকায় মো. জামাল উদ্দিন, বেলাল ও এরশাদ এসব রিকশা নিয়ন্ত্রণ করেন। বায়েজিদ, খুলশী এলাকা ও পাঁচলাইশের হিলভিউসহ আশেপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ করেন মো. এনাম নামের একজন।
বায়েজিদ থানাধীন জামশেদ শাহ মাজার রোড, কুলগাঁও আবাসিক এলাকা হতে খাজা রোড, অক্সিজেন মোড় থেকে আতুরার ডিপু, চন্দ্রনগর, আরেফিন নগর, বাংলা বাজার টেক্সটাইল মোড় ও হিলভিউ আবাসিক এলাকা, রৌফাবাদ কলোনি, বাংলাবাজার বশর কোম্পানির গ্যারেজ পর্যন্ত ৩/৪ হাজার ব্যাটারি রিকশা সামসু নামের একজনের নিয়ন্ত্রণে চলছে।
নগরীর হালিশহর ও পাহাড়তলী থানাধীন ফইল্যাতলী বাজার থেকে সবুজবাগ পেট্রোল পাম্পের মুখ, হালিশহর বি-ব্লক শাহজাহান বেকারির সামনে থেকে আশপাশের পুরো এলাকা, শারীরিক শিক্ষা কলেজ থেকে সাগরপাড়, বণিকপাড়া হরি মন্দির আইয়ুব খানের গ্যারেজ থেকে পাহাড়তলী থানা এলাকার সাগরিকা রোড, বেপারিপাড়া কাসেম কোম্পানির গ্যারেজ হয়ে আগ্রাবাদ আবাসিক এলাকার ২৯টি সড়ক পর্যন্ত ১৫ হাজারের অধিক ব্যাটারি রিকশা চলাচল করছে। এছাড়া আকবরশাহ এলাকায় সবুজের নিয়ন্ত্রণে পাঁচ শতাধিক ব্যাটারি রিকশা চলছে। হালিশহর-পাহাড়তলী থানা এলাকায় ব্যাটারি রিকশা নিয়ন্ত্রণ করেন ছানা উল্লাহ ও রণজিৎ দেবনাথ।
ডবলমুরিং থানাধীন বিল্লাপাড়া পুলিশ বিট হয়ে ৯নং ব্রিজ ও ভাঙ্গা ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ব্যাটারি রিকশা চলাচল করছে। এসব নিয়ন্ত্রণে আছেন স্থানীয় শান্ত, কাশেম ও আলম। তারা বিল্লাপাড়া, বেপারিপাড়া ও রঙ্গি পাড়ায় আলাদাভাবে টাকা তোলেন। এছাড়াও ইপিজেড থানাসহ অন্যান্য অভ্যন্তরীন সড়কে আরও পাঁচ হাজারের মত ব্যাটারি রিকশা চলাচল করছে বলে জানিয়েছে গ্যারেজ মালিকরা। তবে সেগুলোর কোন সুনির্দিষ্ট লাইন পাওয়া যায়নি।
হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা: রিট পিটিশন নং ১৯৯৭/২০১৪ মূলে একটি রুল জারি করেছিল উচ্চ আদালত, যেখানে বলা হয়েছে, ”চট্টগ্রাম শহরে ব্যাটারি চালিত রিকশা কেন বন্ধ করা হবে না তার উপযুক্ত কারন দর্শাতে বলা হয়েছিল।” ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম মহানগরে ব্যাটারিচালিত রিক্সা চলাচল বন্ধ করার জন্য দুটি সংগঠনের পক্ষ থেকে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছিল। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধের নির্দেশনা দেন। পরবর্তীতে এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করে ব্যাটারিচালিত রিকশা মালিক সমিতি। আপিল বিভাগের সাত সদস্যের বেঞ্চ হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখেন। এরপর থেকে চট্টগ্রামে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০২২ সালে ৩৯ নং সিভিল পিটিশন লিভ টু আপিলের শুনানিতে বলা হয়েছে দেশের মহাসড়কে ব্যাটারি রিক্সা চলাচল বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য। সুতরাং বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরে ব্যাটারি চালিত রিকশা চলাচলের কোন অনুমতি বা বৈধতা নেই।
সার্বিক দিক বিবেচনায় রাজস্ব আদায়ের লক্ষে সম্প্রতি সিটি কর্পোরেশনের একটি সাধারণ সভায় এসব ব্যাটারি রিকশাকে একটা নীতিমালায় আনার জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল কিন্তু তা ঝুলে আছে। নীতিমালা বাস্তবায়ন করা জরুরি। তবে সেসব রিকশায় থাকবে সোলার সিস্টেম এবং গতিরোধক যন্ত্র। কোন অবস্থাতেই যাতে ২০ কিলোমিটারের অধিক গতিতে রিকশা চলতে না পারে সে বিষয়টি আমাদের বিবেচনায় থাকবে। আশা করছি এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে চাঁদাবাজিও বন্ধ হবে আর সরকারও রাজস্ব বঞ্চিত হবে না। এমনিতেই এর ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে তাই নতুন করে যেন কোন রিকশা সড়কে না নামে সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে এবং আমদানী, উৎপাদন ও বাজারজাত বন্ধে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি বলে মনে করে সচেতন মহল।
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন