সাইমা আক্তারঃ মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অবহেলিত! কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর ১০ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। বাংলাদেশেও এ দিবস পালনের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা হয়। তবে, বাস্তবতা হলো, দেশে মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালে দেশে ৫১৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, যার মধ্যে ৯৮ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এই সংখ্যা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মানসিক চাপে ভেঙে পড়েন নানা কারণে। পারিবারিক চাপ, বেকারত্ব, নতুন পরিবেশে মানিয়ে চলার চ্যালেঞ্জ, প্রেমে ব্যর্থতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মতো বিষয়গুলো তাদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। এসব চাপ শিক্ষার্থীদের হতাশাগ্রস্ত করে তোলে এবং অনেকেই অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। যেমন, মাদক গ্রহণ, ছিনতাই, বা অন্য কোনো অরাজকতায় জড়িয়ে পড়া।
মাদক এবং মানসিক স্বাস্থ্য
বিভিন্ন শিক্ষার্থী মানসিক চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে মাদকের পথ বেছে নেন। তারা ভুলভাবে মনে করেন যে, এটি তাদের সমস্যার সমাধান করবে। কিন্তু বাস্তবে, মাদক তাদের জীবনকে আরও জটিল করে তোলে এবং ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। একবার মাদকের চক্রে প্রবেশ করলে, সেখান থেকে বের হওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায়। তাই শিক্ষার্থীদের এই পথে যাওয়া ঠেকাতে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা অত্যন্ত জরুরি।
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা তাদের একাডেমিক এবং ব্যক্তিগত জীবনের জন্য অপরিহার্য। উচ্চশিক্ষার সময় শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা, এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে উদ্বেগের মতো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হলে তা তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্সকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।
সুস্থ মানসিক অবস্থা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, সামাজিক সংযোগ গড়ে তোলে এবং সমস্যার সমাধান করতে সাহায্য করে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং সেশন চালু করা প্রয়োজন। এসব উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের চাপ সামলাতে এবং সুস্থভাবে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
সবুজায়ন এবং মানসিক স্বস্তি
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সবুজ পরিবেশ এবং খোলা জায়গার উপস্থিতি শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটালে মানসিক চাপ হ্রাস পায় এবং মনোযোগ বৃদ্ধি পায়। তাই ক্যাম্পাসগুলোতে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা উচিত যা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে এবং একটি স্বাস্থ্যকর মানসিক অবস্থা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
কিশোর-তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য
শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যও গুরুত্বের দাবি রাখে। টিনএজ বয়সে শারীরিক এবং মানসিক পরিবর্তনের কারণে তারা বিশেষ চাপের মুখোমুখি হয়। অনেকেই ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে, রাগ বা অভিমান দেখায়, কিংবা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ প্রকাশ করে। এসবই মানসিক চাপের লক্ষণ।
এ সময় শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো অভিভাবক এবং শিক্ষকদের দায়িত্ব। তাদের চিন্তা-ভাবনা বোঝা এবং সঠিক পরামর্শ দেওয়া তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে।
অভিভাবক এবং শিক্ষকদের ভূমিকা
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে অভিভাবক এবং শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। তাদের উচিত শিক্ষার্থীদের প্রতি যত্নশীল থাকা এবং তাদের সমস্যাগুলো বুঝে সমাধানের চেষ্টা করা। শিক্ষার্থীদের যদি সঠিক মানসিক সহায়তা দেওয়া যায়, তারা ভবিষ্যতে সমাজের জন্য উপযুক্ত নাগরিক হয়ে উঠবে।
মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক সুস্থতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, স্বাস্থ্য বলতে শারীরিক, মানসিক, আত্মিক এবং সামাজিকভাবে ভালো থাকার নাম। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই, শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতার যত্ন নেওয়াও অত্যন্ত প্রয়োজন।
পরিশেষে,মানসিক স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সবার জীবনেই গভীর প্রভাব ফেলে। এটি অবহেলা করলে সমাজে নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তাই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, সঠিক কাউন্সেলিং এবং শিক্ষার্থীদের চাপ সামলানোর দক্ষতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমিয়ে তাদের মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তোলা সম্ভব। এই পথেই আমরা একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ এবং সুষ্ঠু মানসিক পরিবেশ তৈরি করতে পারব।
সাইমা আক্তার
সেচ্ছাসেবীকা,কায়ো বাংলাদেশ,ব্রাইট বাংলাদেশ ফোরাম, একশনএইড বাংলাদেশ
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন