কলমে- ধর্মদূত স্থবির এম ধর্মবোধি ভান্তে
বর্তমানে বাংলাদেশের বুদ্ধ পূর্ণিমা নিয়ে যে বিতর্কিত কথাবার্তা শুরু হয়েছে তার বিতর্ক দূরবীভূত হোক– এই প্রত্যাশায় আমি লিখাটা লিখেছি। মূলতো অনেক দায়ক-দায়িকা বৃন্দ ইতিহাস নিয়ে তেমন গবেষণা করেন না, আজকের এই লিখাটি একটি দলিল হিসাবে সেয়ার করে আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস সবার কাছে পৌঁছে দিন।
বাংলাদেশে বুদ্ধপূর্ণিমার ইতিহাস বহু প্রাচীন। এই অঞ্চল প্রাচীনকাল থেকেই বৌদ্ধ ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। বিশেষ করে প্রাচীন সমতট, পুণ্ড্রবর্ধন এবং হরিকেল অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্ম ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল।
খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে গৌতম বুদ্ধ-এর আবির্ভাবের পর তাঁর শিক্ষা এই অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
মৌর্য সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে বিশেষ ভূমিকা রাখেন এবং তাঁর সময় থেকেই বুদ্ধপূর্ণিমা পালনের ধারা শক্তিশালী হয়।
পরে পাল রাজাদের আমলে (৮ম–১২শ শতাব্দী) বাংলাদেশে বৌদ্ধ ধর্মের স্বর্ণযুগ শুরু হয়। তখন বুদ্ধপূর্ণিমা ব্যাপকভাবে উদযাপিত হতো।
তখনকার বিখ্যাত মহাবিহার যেমন পাহাড়পুর সোমপুর মহাবিহার ও মহাস্থানগড়-এ বুদ্ধপূর্ণিমা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালিত হতো।
বর্তমান বাংলাদেশে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের বৌদ্ধ সম্প্রদায় ঐতিহ্যগতভাবে এই উৎসব পালন করে আসছে।
বুদ্ধের শাশ্বত বাণী ও করুণাময় শিক্ষায় আলোকিত হোক সমগ্র বিশ্বজগৎ। অহিংসা, মৈত্রী, করুণা ও প্রজ্ঞার এই মহামূল্যবান আদর্শ প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে বিকশিত হোক—এই হোক আমাদের আন্তরিক প্রার্থনা।
শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমার এই পবিত্র ও মহিমান্বিত দিনে সকল প্রাণীর কল্যাণ, সুখ ও শান্তি কামনা করছি। মানুষের অন্তরে জাগ্রত হোক সত্যের অনুসন্ধান, দূর হোক হিংসা, দ্বেষ ও অজ্ঞতার অন্ধকার।
সবাই সুস্থ, সুন্দর ও শান্তিময় জীবন লাভ করুন—এই মঙ্গল কামনায় জানাই শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মৈত্রীময় আশীর্বাদ।
বুদ্ধ পূর্ণিমা (বৈশাখী পূর্ণিমা) বৌদ্ধধর্মের অন্যতম প্রধান ও সর্বাপেক্ষা পবিত্র উৎসব। এই দিনটি কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বরং মানবতার জন্য এক গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও জীবনদর্শনের স্মারক।
বুদ্ধ পূর্ণিমার তাৎপর্য
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, এই পূর্ণিমা তিথিতেই তিনটি মহৎ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল—
১/ গৌতম বুদ্ধ-এর জন্ম ২\ সম্যক সম্বোধি (বুদ্ধত্ব লাভ) ৩/ মহাপরিনির্বাণ, এই তিনটি ঘটনাই মানব ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছে। তাই বুদ্ধ পূর্ণিমা “ত্রিস্মৃতি বিজড়িত” পবিত্র দিন হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসচ্ছে।
বুদ্ধের শিক্ষা:
মানবতার আলোকবর্তিকা বুদ্ধের মূল শিক্ষা ছিল অত্যন্ত সরল কিন্তু গভীর যেমন ধরুন অহিংসা- বুদ্ধ প্রাণীহত্যা বর্জন করতে বলেছেন এবং এবং সকল প্রাণের সম অধিকারের কথা বলেছে। মৈত্রী– সকল প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা কথা বলেছেন।
করুণা– দুঃখী ও অসহায়ের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করতে বলেছেন। প্রজ্ঞা– সঠিক জ্ঞান ও আত্ন উপলদ্ধির কথা বলেছেন।
তথাগত বুদ্ধ শিখিয়েছেন যে, দুঃখের কারণ আমাদের তৃষ্ণা ও আসক্তি, এবং এর নিরসনের পথ হলো আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ—সৎ দৃষ্টি, সৎ সংকল্প, সৎ বাক্য, সৎ কর্ম, সৎ জীবিকা, সৎ চেষ্টা, সৎ স্মৃতি ও সৎ সমাধি।
বুদ্ধ পূর্ণিমার পালন পদ্ধতি–
এই দিনে বুদ্ধ ভক্তরা নানা ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন—বিহারে গিয়ে ত্রিশরণ ও পঞ্চশীল গ্রহণ করেন, ধ্যান ও ভাবনা (মেডিটেশন) অনুশীলন করেন, বুদ্ধ পূজা, প্রদীপ প্রজ্বালন ও ফুল অর্পণ, নানাবিধ দান, সংঘদান, গরীবদের সাহায্য, প্রাণী মুক্তি,ধর্মদেশনা শ্রবণ করেন। তবে এই দিনে জীবনের নেতিবাচক দিক ত্যাগ করে নতুনভাবে সৎ পথে চলার অঙ্গীকার করাই উত্তম।
সামাজিক ও মানবিক গুরুত্ব-
বুদ্ধ পূর্ণিমা কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি মানবতার উৎসব। বর্তমান বিশ্বে যেখানে হিংসা, সংঘাত ও অশান্তি বিরাজ করছে, সেখানে বুদ্ধের শিক্ষা শান্তি ও সহমর্মিতার এক অনন্য পথ দেখায়।
এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—“ঘৃণা দ্বারা ঘৃণা কখনো নিবৃত্ত হয় না; ভালোবাসা দ্বারাই ঘৃণা নিবৃত্ত হয়।
বুদ্ধ পূর্ণিমা আমাদের জীবনে আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা ও মানবতার মূল্যবোধ জাগ্রত করার এক মহামূল্যবান সুযোগ। এই পবিত্র দিনে আমরা যদি বুদ্ধের আদর্শ অন্তরে ধারণ করি, তবে ব্যক্তি, সমাজ ও বিশ্ব—সব ক্ষেত্রেই শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
বাংলাদেশে বুদ্ধপূর্ণিমা (বৈশাখী পূর্ণিমা) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব, যা গৌতম বুদ্ধ-এর জন্ম, বোধিলাভ এবং মহাপরিনির্বাণ—এই তিনটি মহান ঘটনার স্মরণে উদযাপিত হয়। নিচে এর সূচনা, ইতিহাস ও পালনের ধারাবাহিকতা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
বাংলাদেশে বুদ্ধপূর্ণিমার সূচনা–
বাংলাদেশে বুদ্ধপূর্ণিমা পালনের ইতিহাস বহু প্রাচীন। এটি মূলত শুরু হয় ভারতীয় উপমহাদেশে বৌদ্ধধর্ম বিস্তারের সময় থেকে।
ইতিহাস গবেষণা করে যদি বলি প্রাচীন যুগে
খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার পর সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে বৌদ্ধ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় বুদ্ধের জন্ম, বোধিলাভ ও মহাপরিনির্বাণ দিবস হিসেবে বৈশাখী পূর্ণিমা বিশেষ মর্যাদা পায়। সেই সময় থেকেই বর্তমান বাংলাদেশের অঞ্চল (তৎকালীন বঙ্গ) বুদ্ধপূর্ণিমা উদযাপনের সঙ্গে যুক্ত হয়।
মধ্যযুগ ও পরবর্তী সময়ে পাল রাজবংশ (৮ম–১২শ শতাব্দী) বাংলায় বৌদ্ধধর্মের অন্যতম স্বর্ণযুগ ছিল। এই সময় বুদ্ধপূর্ণিমা রাজকীয়ভাবে পালিত হতো। বিহার, স্তূপ ও শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, পূজা ও দান কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হতো।
ঔপনিবেশিক ও আধুনিক যুগ ধরে বলতে গেলে- ব্রিটিশ শাসনামলে বৌদ্ধ সম্প্রদায় আবার সংগঠিতভাবে বুদ্ধপূর্ণিমা উদযাপন শুরু করে।
১৯শ শতাব্দীতে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে এ উৎসব নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পায়।
স্বাধীন বাংলাদেশ জম্মে পৃর্বে বুদ্ধপূর্ণিমা পালিত হতো ঠিক তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বুদ্ধপূর্ণিমাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আওতায় এনে সরকারি ছুটিও ঘোষনা করা হয় সুতরাং বুদ্ধপূর্ণিমা এখন একটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য এলাকায় ব্যাপকভাবে এই উৎসব উদযাপিত হয়ে আসচ্ছে অধিকাল থেকে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের আগে—অর্থাৎ ১৯৭১ সালের পূর্বে—এই অঞ্চলে (তৎকালীন পূর্ব বাংলা, পরে পূর্ব পাকিস্তান) বৌদ্ধ সম্প্রদায় অত্যন্ত আন্তরিকতা ও ধর্মীয় ভক্তির সঙ্গে বুদ্ধপূর্ণিমা পালন করত। তখনকার আয়োজন আজকের মতো বড় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত না হলেও, এর ধর্মীয় গভীরতা ছিল খুবই সমৃদ্ধ।
জগতের সমস্ত প্রাণি সুখি হোক,
লেখক পরিচিতি:অধ্যক্ষ, গুমানমদ্দন শান্তি বিহার, হাটহাজারি। প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, শ্রদ্ধালংকার বুদ্ধ বিহার ও ভাবনা কুঠির, পুরাতন চান্দগাঁও।
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন