কক্সবাজার রেল স্টেশনে উদ্বোধনের প্রায় দুই বছর পরও পর্যাপ্ত আলোর অভাব, নোংরা ও অচল টয়লেট, লকার ও লাগেজ সুবিধা না থাকা এবং স্টেশন পরিচালনায় কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে ব্যাপক অব্যবস্থাপনা চলছে, এর ফলে যাত্রীরা, বিশেষ করে পর্যটকরা নানা সমস্যা ও ভোগান্তিতে পড়ছেন। এছাড়া ২১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ঝিনুকের আদলে তৈরি স্টেশন ভবনটির নির্মাণকাজের নানা ত্রুটি, অব্যবস্থাপনা, অনিয়মসহ পুরো প্রকল্প জুড়ে অনিয়ম, কমিশন বানিজ্য, দূর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার তথ্য সামনে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন জুড়ে অনিয়ম অব্যবস্থাপনা, সিডিউল বিপর্যয়, পর্যাপ্ত আলোর অভাব, অচল টয়লেট, লকার ও লাগেজ সুবিধা না থাকা,ট্রেন চলাচল সময়ে স্টেশনে দ্বায়িত্বরতদের অনুপস্থিতি, কোন ট্রেন কোন প্লেটফরমে আসবে তার নির্দেশনা না থাকা, স্টেশন গুলোতে বখাটেদের উৎপাত, কয়েকটি স্থানে ফাটল,মাদক পাচারের নিরাপদ রুট, স্টেশন গুলোতে সংযোগ সড়ক না থাকাসহ যাত্রী ও পর্যটকদের হয়রানি চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। এনিয়ে পর্যটক ও যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত এই রেল স্টেশনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা যাত্রীদের হতাশ করেছে। সম্ভাবনাময় এই প্রকল্পটি এখন প্রশ্নের মুখে।
সরেজমিন কক্সবাজারের আইকনিক স্টেশনে দেখা যায়, স্টেশন লাগোয়া একটি ভবনের সিলিংয়ে আনুমানিক সাত ফুটের একটি ফাটল দেখা দিয়েছে। তার নিচে শ্যাওলাও জমতে শুরু করেছে। তিনতলা আইকনিক ভবনের টিকিট বিক্রির কক্ষ ও একটি শৌচাগার ছাড়া পুরোটাই অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।
সরেজমিন রামু স্টেশনে দেখা যায়, স্টেশনের সীমানা প্রাচীরের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। ওভারপাসের সিঁড়িতে বসে ছেলেমেয়েরা আড্ডা দিচ্ছে। এ ছাড়া পুরো স্টেশনই ফাঁকা। স্টেশন মাস্টার জানান, তার এখানে দশটি টিকিট বরাদ্দ রয়েছে। প্রতিদিন ছয় থেকে সাতটি টিকিট বিক্রি হয়। একটি মাত্র লোকাল ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত যাতায়াত করে।
ঈদগাহ উপজেলার ইসলামাবাদ স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, স্টেশনের লোহার গ্রিল আগাছায় ঢেকে যাচ্ছে। প্রকল্পের কর্মকর্তা ইমরান জানান, স্টেশনে এখনও ট্রেন থামে না, লোকবলও নেই। এজন্য পরিচ্ছন্নতার কাজ করা হচ্ছে না। এগুলো কেটে ফেলে দিলেই হবে।
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় ৯টি স্টেশন তৈরি করা হয়েছে। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণই এখন বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্র ছয়টিতে ট্রেন থামে, বাকি তিনটিতে থামে না। অর্থাৎ এগুলোর কোনো কাজ নেই। আবার স্টেশনে আসার জন্য সংযোগ সড়ক নেই তিনটিতে। স্টেশনে আসতে হলে হেঁটে আসতে হয়। কয়েকটি স্টেশনের পাশের সংযোগ সড়ক অনেক সরু দেখা গেছে।
আধুনিক, দৃষ্টিনন্দন এশিয়ার অন্যতম এই রেল স্টেশন ঘিরে রেলযাত্রীদের অনেক স্বপ্ন। পরিপূর্ণভাবে এই স্টেশন ভবনের কাজ শেষ হলে স্টেশন ভবনে যাত্রীরা অনেক সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে না। বিশেষ করে যাত্রীদের থাকা–খাওয়ার তারকা মানের হোটেল, রেস্টুরেন্ট, শপিংমল, কমিউনিটি সেন্টার, যাত্রীদের মালামাল রাখার লকার, শিশু যত্ন কেন্দ্র, মসজিদসহ অত্যাধুনিক সব ধরনের সুযোগ–সুবিধা। কেউ চাইলে রাতের ট্রেন ধরে সকালে কক্সবাজার পৌছে মালামাল স্টেশনে রেখে সারা দিন সমুদ্রসৈকত বা পর্যটন স্পট ঘুরে রাতে আবার ফিরে যেতে পারবেন। কিন্তু ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ার ২ বছর পরও স্টেশন বিল্ডিংটি চালু করতে পারেনি রেল কর্তৃপক্ষ। যার কারণে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে ট্রেন যাত্রীরা স্টেশনের সুযোগ–সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, স্টেশনে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই, রাতের বেলায় অনেকটাই ভূতুরে পরিবেশ এবং যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত টয়লেটগুলো ব্যবহার অনুপযোগী। যাত্রীদের মালামাল রাখার কোনো নিরাপদ ব্যবস্থা এখনো চালু হয়নি, যা পর্যটকদের হতাশ করছে। খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ, সময়সূচি বিপর্যয় এবং টিকিট ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনাও দেখা গেছে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ স্টেশনটি ঠিক মতো পরিচালনা করতে পারছে না, ফলে দোকান, এটিএম বুথ, ডাকঘর, বিশ্রামাগার ইত্যাদি সুবিধা চালু হয়নি।
কক্সবাজার রেলস্টেশন একটি ‘আইকনিক’ স্থাপনা হলেও, এর পরিচালনা ও যাত্রীসেবার মান নিশ্চিতকরণে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে, যা রেল কর্তৃপক্ষের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন সচেতন মহল।
ঢাকা থেকে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পর্যটক ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, এই স্টেশনে কোন সুযোগ সুবিধা নেই। যেন এটা আল্লার ওয়াস্তে চলে। কারো কোন দ্বায়বদ্ধতা নেই। দ্বায়িত্বরত কাউকে পাওয়া যায় না। ফলে ট্রেনের বিষয়ে কোন প্রকারের তথ্য পাওয়া যায় না। এছাড়া ট্রেন গুলো সময়মত ছাড়ে না। বেশিরভাগ সময় শিডিউল বিপর্যয় ঘটে। মোটকথা ভোগান্তির আরেক নাম কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন ও ট্রেন ভ্রমন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সৌরভ নামে এক যাত্রী জানান, প্রথমবার ট্রেন যোগে কক্সবাজার যাওয়ার অভিজ্ঞতা খুব বাজে, মোট কথা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা ছাড়া কিছুই নেই। কোন প্রকারের তথ্যের জন্য কাউকে পাওয়া যায় না। স্টেশন মাস্টারের রুমে তালা দেয়া থাকে ফলে ট্রেন সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। সময়মত ট্রেন ছাড়েনা, প্রায়ই শিডিউল বিপর্যয় ঘটে। যাত্রীরা অনেকটাই অসহায়। এভাবে চলতে থাকলে যাত্রীরা মুখ ফিরিয়ে নিবে।
কক্সবাজার রেল স্টেশন এর পাশের এক দোকানদার জানান, এই স্টেশন এককথায় উপরে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট। মাঝে মধ্যে মাদকের চালানও যায় বলে শুনেছি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার ও কক্সবাজার – দোহাজারি প্রকল্প পরিচালক মো: সুবক্তগীন এর কাছে জানতে চাইলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান।
উল্লেখ্য, চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) সঙ্গে যৌথভাবে আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন ভবনটি তৈরি করেছে বাংলাদেশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড।
পরবর্তী পর্বে প্রকল্প জুড়ে অনিয়ম, কমিশন বানিজ্য, দূর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার তথ্য নিয়ে আসছে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন