ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ, কড়া হুমকি ও কঠোর দমন-পীড়নের আশঙ্কা সত্ত্বেও ইরানে টানা দ্বিতীয় রাতের মতো ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। শুক্রবার রাতেও রাজধানী তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন শহরের রাস্তায় নেমে আসে দেশটির জনগণ। এ সময় রাজধানীর উত্তরাঞ্চলের অভিজাত এলাকা সাদাত আবাদে বিক্ষোভকারীরা একটি মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেন।
বিবিসি পার্সিয়ান টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভিডিওতে দেখা গেছে, তেহরানে হাজার হাজার মানুষ মিছিল করছে।এ সময় তারা একটি মসজিদে আগুন দিয়ে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের সময় ক্ষমতাচ্যুত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনামলের রাজতান্ত্রিক পতাকা প্রদর্শন করেন।
৬০ বছর বয়সী লাদান (ছদ্মনাম) বলেন, টানা দ্বিতীয় রাত রাস্তায় নেমেছেন তিনি। সরকারি প্রতিহিংসার আশঙ্কায় তিনি পুরো নাম প্রকাশ করতে চাননি।
তেহরানের পাশাপাশি মাশহাদ, তাবরিজ, উরুমিয়েহ, ইসফাহান, কারাজ ও ইয়াজদসহ একাধিক শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার বড় ধরনের পতন ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ছিল এর তাৎক্ষণিক কারণ। তবে দ্রুতই তা রূপ নেয় দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধে সামগ্রিক ক্ষোভে।
লন্ডনের থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে প্রবল গতি তৈরি হয়েছে। মানুষের গভীর ক্ষোভই এই আন্দোলনের চালিকাশক্তি। মানুষ আর পিছু হটছে না, দমন-পীড়নের আশঙ্কা সত্ত্বেও তারা রাস্তায় থাকছে।’
উত্তর-পশ্চিম ইরানভিত্তিক স্যাটেলাইট চ্যানেল এএনটি টিভির পরিচালক এলইয়ার কামরানি ইস্তাম্বুল থেকে টেলিফোনে জানান, শনিবার আরো বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে। তার দাবি, নিরাপত্তা বাহিনী একদিকে দমন চালাচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক দুরবস্থার কথা বলে মানুষকে ‘নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে’ ঘরে ফেরার অনুরোধ করছে।
শুক্রবার সরকার প্রায় সব ধরনের যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। ইন্টারনেট শাটডাউন করা হয়, বিদেশ থেকে ফোনকল বন্ধ এবং দেশের ভেতর মোবাইল নেটওয়ার্ক মারাত্মকভাবে ব্যাহত করা হয়। এমনকি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার ওয়েবসাইটও বন্ধ হয়ে যায়।
বিপ্লবী গার্ডের গোয়েন্দা শাখা থেকে শুক্রবার রাতে নাগরিকদের মোবাইলে একটি বার্তা পাঠানো হয়। তাতে ‘সন্দেহজনক ও ধ্বংসাত্মক’ ব্যক্তিদের বিষয়ে একটি হটলাইনে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানানো হয় এবং অভিভাবকদের সন্তানদের রাস্তায় যেতে নিষেধ করতে বলা হয়। বার্তায় বিক্ষোভে অংশ নেওয়াকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিসহ সহিংস দমন ও নির্বিচার গ্রেপ্তারে এ পর্যন্ত অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশু ও পথচারীও রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কেউ কেউ নিহতের সংখ্যা আরো বেশি বলে দাবি করছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস যাচাইকৃত এক ভিডিওতে টেহরানের আল-গাদির হাসপাতালে অন্তত সাতজনকে নিথর পড়ে থাকতে দেখা গেছে, যাঁদের মৃত বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভিডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘ওরা মানুষ মেরেছে, যুদ্ধের গুলিতে মানুষ মেরেছে।’
তথ্য অবরোধ সত্ত্বেও স্টারলিংক স্যাটেলাইট সংযোগ ব্যবহার করে কিছু ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা অন্য দেশে পৌঁছাচ্ছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মেহদি ইয়াহইয়ানেজাদ বলেন, ইরানে এখন দশ হাজারের বেশি স্টারলিংক টার্মিনাল সক্রিয় রয়েছে। সরকার এগুলো ঠেকাতে তেহরানে জিপিএস জ্যাম করার চেষ্টা করছে বলেও জানান তিনি।
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন