সুজন ভট্টাচার্য্য,বিশেষ প্রতিনিধিঃ পার্বত্য জেলা বান্দরবানের সবুজ পাহাড় ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। এর সর্বশেষ ও নজিরবিহীন উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছেন বান্দরবান বন বিভাগের আলোচিত কর্মকর্তা, ডেপুটি রেঞ্জার মো. রাশেদুজ্জামান। বান্দরবান বন বিভাগের প্রাক্তন ডিএফও মোহাম্মদ আবদুর রহমানের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা শুরুতে সদর রেঞ্জের লোভনীয় চেয়ার পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। কিন্তু ডেপুটি রেঞ্জার কাজী মো. সাইফুল ইসলামের সাথে দফায় দফায় দেনদরবারে ব্যর্থ হয়ে এবং প্রত্যাশিত ‘প্রাইজ পোস্টিং’ না পেয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত রোয়াংছড়ি উপজেলার দুর্গম খেয়াচল্যং রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্ব নেন। জনসমক্ষে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে এবং দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলাকে ঢাকার জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক অসুস্থতা ও মানসিক হতাশার কথা প্রচার করলেও পর্দার আড়ালে চালিয়ে যাচ্ছেন সংরক্ষিত বনাঞ্চল লুণ্ঠনের এক নিখুঁত নীলনকশা।
ভুতুড়ে কার্যালয় ও কর্মস্থলে অনুপস্থিতি
রোয়াংছড়ির খেয়াচল্যং রেঞ্জ কার্যালয়ে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায় এক চরম দায়িত্বহীন ও ভুতুড়ে পরিবেশ। কার্যালয়ের প্রধান ফটকসহ প্রতিটি কক্ষ তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে এবং সেখানে রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রাশেদুজ্জামান কিংবা তার অধীনস্থ কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর কোনো লেশমাত্র নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই কর্মকর্তা বা তার কোনো স্টাফ কখনোই রেঞ্জ এলাকায় অবস্থান করেন না; এমনকি রেঞ্জের ভৌগোলিক সীমানার আশপাশে কোনো বাসা বা অফিসও ভাড়া নেননি। সরকারি দায়িত্ব ও জবাবদিহিতাকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা ও তার পুরো স্টাফ বাহিনী সার্বক্ষণিক বান্দরবান জেলা শহরে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। যে কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিজ কর্মস্থলেই উপস্থিত থাকেন না, সেই খেয়াচল্যং রেঞ্জকে কার্যত বিলুপ্ত ঘোষণা করাই এখন সময়ের দাবি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্থানীয় সচেতন মহল।
টেবিল জোত পারমিট বাণিজ্যের মহোৎসব
অনুসন্ধানে রাশেদুজ্জামানের টেবিল জোত পারমিট বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উঠে এসেছে। খেয়াচল্যং রেঞ্জের অধীনস্থ ৩১৭ নং ক্যাচলং মৌজা এবং ৩৪৯ নং ঘেরাউ মৌজায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জোতের হোল্ডিং সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। ইতিপূর্বেই এসব মৌজায় জোত পারমিটের কাজ আইনানুগভাবে শেষ হয়েছিল। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৬ মাসের ব্যবধানে ডেপুটি রেঞ্জার রাশেদুজ্জামান একাই সেখানে ২০টি জোত পারমিট অনুমোদন করেছেন।
সরেজমিনে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার খাড়া গাছ যাচাই বা পরিমাপ না করেই তিনি স্থানীয় এসিল্যান্ড অফিস ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কিছু অসাধু ব্যক্তির সাথে যোগসাজশে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে ভুয়া ‘এ-ফরম’ তৈরি করেন। এই প্রক্রিয়ায় একই মৌজা ও একই হোল্ডিং বারবার ব্যবহার করে কৃত্রিম হোল্ডিং সাজানো হয়। এরপর জেলা শহরে বসেই রাতের আঁধারে বনের মূল্যবান কাঠের জন্য অবৈধ খাঁড়া মার্কা ও পাশ মার্কা বসিয়ে তিনি পকেটে পুরছেন লাখ লাখ টাকার অবৈধ মাসোহারা।
ধ্বংসের মুখে পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ
এই নির্বিচার ও বেপরোয়া বৃক্ষ নিধনের সরাসরি বিরূপ প্রভাব পড়ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বন, বন্যপ্রাণী ও সার্বিক পরিবেশ ব্যবস্থার ওপর। ভুয়া জোতের আড়ালে চম্পাফুল, গুটগুটিয়া, বৈলাম, গর্জন ও শিউরীর মতো শতবর্ষী মাদার ট্রি বা মাতৃবৃক্ষ নিধন করার ফলে বনাঞ্চলের ক্যানোপি বা উপরিভাগের ছাউনি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে এশীয় হাতি, মায়াহরিণ ও বিরল প্রজাতির উল্লুকের মতো বিপন্ন বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল স্থায়ীভাবে বিলীন হচ্ছে, যার দরুন মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে চরম সংঘাত তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি, নির্বিচারে পাহাড় ন্যাড়া করার কারণে বর্ষা মৌসুমে মারাত্মক পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধস এবং শুষ্ক মৌসুমে প্রাকৃতিক ঝিরি ও পাহাড়ি ছড়াগুলো শুকিয়ে গিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে।
পরিবেশবাদী ও স্থানীয়দের কঠোর হুশিয়ারি
রোয়াংছড়ির খেয়াচল্যং অঞ্চলের বিভিন্ন পরিবেশবাদী ও ছাত্র সংগঠনের জোরালো অভিযোগ, ডেপুটি রেঞ্জার মো. রাশেদুজ্জামান সরকারি বৈধ কাগজপত্রের আড়ালে এলাকার সহজ-সরল ও দরিদ্র আদিবাসীদের নাম ব্যবহার করে কৃত্রিম কাগজপত্র সাজিয়ে তাদের মৌলিক অধিকার হরণ করছেন। বাঙালি কাঠ ব্যবসায়ীদের সাথে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সংরক্ষিত বনাঞ্চল সাফ করে তিনি এখন কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক বনে গেছেন।
এই বিষয়ে খেয়াচল্যং রেঞ্জ কর্মকর্তা রাশেদুজ্জামান এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ” প্রতিবেদকের প্রশ্নের কোন সদুত্তর না দিয়ে তার ব্যাক্তিগত নানা সমস্যার কথা বলতে থাকেন”।
এই বিষয়ে বান্দরবান বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ( ডিএফও)মোঃ তৌফিকুল ইসলাম বলেন, খেয়াচল্যং রেঞ্জ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গুলো আমি গুরুত্ব সহকারে তদন্তে করে দেখবো”।
বন, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় এই বিতর্কিত কর্মকর্তার গত ৬ মাসে ইস্যুকৃত সকল জোত পারমিটের নথি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের মাধ্যমে অবিলম্বে তদন্ত করে তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছে স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও পরিবেশবাদী মহল।
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন