১০ সেপ্টেম্বর এলেই আত্মহত্যা নিয়ে আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট হয়, পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়, আলোচনা সভা ও সেমিনার হয়। আমরা আত্মহত্যার ভয়াবহতা নিয়ে কথা বলি, সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা বোঝাই, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার কথা বলি। এবারের বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের মূল প্রতিপাদ্যও তাই আমাদের একটু থামিয়ে ভাবতে বলছে, “আত্মহত্যা নিয়ে প্রচলিত ধারণা বদলাই”।
কিন্তু আমার মনে হয়, শুধু আত্মহত্যা সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলালেই হবে না। আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা একজন মানুষের প্রতি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণও বদলাতে হবে।
কারণ একজন মানুষ যখন আত্মহত্যা করে মারা যান, তখন আমরা সাধারণত তার মৃত্যুর গল্পটি শুনি। কিন্তু তার মৃত্যুর আগের গল্পটি কতটা শুনি?
একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে এই প্রশ্নটি আমাকে বারবার ভাবিয়েছে। একজন মানুষ হঠাৎ করে একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন, বিষয়টি অনেক সময় এত সরল নয়। তার ভেতরে হয়তো দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কষ্ট ছিল। হয়তো সে বহুবার কোনোভাবে বোঝাতে চেয়েছে যে সে ভালো নেই। হয়তো বলেছে, “আমি আর পারছি না।” হয়তো আচরণে পরিবর্তন এসেছে। হয়তো মানুষের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। হয়তো ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু আমরা অনেক সময় সেসব সংকেতকে গুরুত্ব দিইনি।
তারপর একদিন মানুষটি আর থাকে না।
পুলিশ আসে। ঘটনা নথিভুক্ত হয়। তদন্ত হয়। অপমৃত্যুর মামলা হয়। ময়নাতদন্ত হয়। পরিবারের কান্না, প্রতিবেশীদের ভিড়, নানা প্রশ্ন এবং সামাজিক আলোচনা শুরু হয়।
সবকিছু যেন মৃত্যুর পর থেকেই শুরু হয়।
কিন্তু আমার প্রশ্ন, মানুষটি যখন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমরা কোথায় ছিলাম?
এই প্রশ্নটি অস্বস্তিকর। কিন্তু আত্মহত্যা প্রতিরোধের আলোচনাকে সত্যিকার অর্থে সামনে নিতে হলে এই অস্বস্তিকর প্রশ্নটিই করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে প্রতিবছর বিশ্বে সাত লাখের বেশি মানুষ আত্মহত্যায় মারা যান। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ আত্মহত্যা। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেই এর বড় অংশ ঘটে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন গবেষণা ও সূত্রে আত্মহত্যার উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের সমস্যার একটি বড় জায়গা হলো, আত্মহত্যা ও আত্মহত্যার চেষ্টার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং নিয়মিত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও এখনও অনেক ঘাটতি রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। একটি আত্মহত্যার সংখ্যা কখনোই শুধু একটি সংখ্যা নয়। এর পেছনে একজন মানুষ থাকে, একটি পরিবার থাকে, কিছু অসমাপ্ত সম্পর্ক থাকে, কিছু অপূর্ণ স্বপ্ন থাকে এবং অনেক সময় এমন কিছু না-বলা কষ্ট থাকে, যেগুলো আমরা তার মৃত্যুর পরও আর জানতে পারি না।
আত্মহত্যার কারণও একক নয়। একজন মানুষ মানসিক যন্ত্রণায় থাকতে পারেন, কিন্তু সেই যন্ত্রণার পেছনে থাকতে পারে পারিবারিক সংকট, সম্পর্কের ভাঙন, আর্থিক অনিশ্চয়তা, চাকরি হারানো, সামাজিক অপমান, নির্যাতন, একাকিত্ব, বৈষম্য, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা কিংবা কোনো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার ক্ষত। কখনো এসবের কয়েকটি একসঙ্গে একজন মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে পারে, যেখানে তার কাছে নিজের জীবনটাকেই অসহনীয় মনে হয়।
এই বাস্তবতাটি আরও স্পষ্টভাবে দেখা যায় শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবনে।
এফডিএমএন জনগোষ্ঠীর দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারি, মানুষের মানসিক সুস্থতাকে তার চারপাশের বাস্তবতা থেকে আলাদা করা যায় না। দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুতি, সহিংসতার স্মৃতি, প্রিয়জন হারানোর বেদনা, নিরাপত্তাহীনতা, সীমিত জীবিকার সুযোগ, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘস্থায়ী নির্ভরশীলতা একজন মানুষের ভেতরে গভীর হতাশা তৈরি করতে পারে। সেখানে আত্মহত্যা প্রতিরোধ শুধু কাউকে কিছু পরামর্শ দেওয়ার বিষয় নয়। সেখানে নিরাপত্তা, মর্যাদা, জীবিকা, সামাজিক সম্পর্ক, সেবা পাওয়ার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার প্রশ্নও জড়িয়ে থাকে।
এই কারণেই আত্মহত্যাকে শুধু একটি মানসিক রোগের বিষয় হিসেবে দেখলে আমরা সমস্যাটির বড় একটি অংশ দেখতে পাব না।
আমাদের সমাজে আরও একটি ভুল ধারণা আছে। কেউ যখন বলে, “আমি আর বাঁচতে চাই না”, আমরা অনেক সময় সেটিকে নাটক, আবেগ কিংবা মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টা বলে উড়িয়ে দিই। অথচ একজন মানুষ যখন নিজের জীবন নিয়ে এমন কথা বলেন, তখন তার কথাকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা দরকার। তাকে বিচার করার আগে তার কষ্টটাকে বোঝার চেষ্টা করা দরকার।
কারণ সেই মুহূর্তে হয়তো মানুষটি আসলে মৃত্যু চাইছেন না। তিনি হয়তো তার অসহনীয় কষ্ট থেকে বের হওয়ার কোনো পথ খুঁজছেন।
আর সেই পথটি যদি আমরা তাকে দেখাতে পারি?
হয়তো একটি জীবন বেঁচে যেতে পারে।
এই জায়গাটিতেই আমাদের বর্তমান ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে হবে।
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ও পরিকল্পনা রয়েছে। আত্মহত্যা প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তাও সেখানে স্বীকৃত। কিন্তু নীতিমালা থাকা আর মাঠপর্যায়ে একজন সংকটাপন্ন মানুষের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এক বিষয় নয়।
কোনো তরুণ যদি রাতের বেলায় তার বন্ধুকে ফোন করে বলে, “আমি আজ নিজেকে শেষ করে দিতে চাই”, তখন বন্ধুটি কী করবে?
কোনো শিক্ষক যদি বুঝতে পারেন তার শিক্ষার্থী আত্মহত্যার কথা ভাবছে, তখন তিনি কাকে জানাবেন?
কোনো নারী নির্যাতনের পর আত্মহত্যার চিন্তায় ভুগলে তাকে কোথায় নেওয়া হবে?
কোনো পুলিশ সদস্য যদি একজন সম্ভাব্য আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষকে উদ্ধার করেন, তাহলে তার পরবর্তী মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?
কোনো হাসপাতালে আত্মহত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়া একজন মানুষ শারীরিক চিকিৎসা পাওয়ার পর বাড়ি ফিরে গেলে তার পরবর্তী খোঁজ কে নেবে?
আমাদের কি প্রতিটি প্রশ্নের একটি স্পষ্ট উত্তর আছে?
যদি না থাকে, তাহলে শুধু সচেতনতা দিয়ে আত্মহত্যা প্রতিরোধ সম্ভব নয়।
আমাদের এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা দরকার, যেখানে পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষক, সমাজকর্মী, উন্নয়নকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী, হাসপাতাল, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো জানবে, সংকটের মুহূর্তে কে কী করবে।
একজন পুলিশ সদস্যকে মনোবিজ্ঞানী হতে হবে না। একজন শিক্ষককে চিকিৎসক হতে হবে না। একজন সমাজকর্মীকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হতে হবে না। তাদের শুধু জানতে হবে, কোন সংকেতকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং কোথায় দ্রুত মানুষটিকে পৌঁছে দিতে হবে।
আমাদের হাসপাতালগুলোতেও আত্মহত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষকে শুধু শারীরিক চিকিৎসা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। তার মানসিক অবস্থার মূল্যায়ন, পরিবারের সঙ্গে কথা বলা, প্রয়োজনীয় সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা এবং পরবর্তী সময়ে তার খোঁজ নেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
কারণ আত্মহত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়া মানেই ঝুঁকি শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
বরং সেই সময়টিই হতে পারে একজন মানুষকে নতুন করে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
একইভাবে, কেউ আত্মহত্যা করে মারা গেলে শুধু ঘটনাটির আইনগত নিষ্পত্তি করেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়। তার পরিবার, সন্তান, বাবা-মা, ভাই-বোন কিংবা কাছের মানুষগুলোও গভীর মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে যেতে পারেন। তাদেরও সহায়তা প্রয়োজন।
একজন মানুষের মৃত্যু অনেক সময় আরও অনেক মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে।
তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধকে আমি শুধু স্বাস্থ্যসেবার বিষয় হিসেবে দেখতে চাই না। একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আমি এটিকে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার, মর্যাদার অধিকার এবং প্রয়োজনের সময়ে সহায়তা পাওয়ার অধিকার হিসেবেও দেখি।
রাষ্ট্র যদি একজন মানুষের মৃত্যুর পর তার মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করতে পারে, তাহলে তার মৃত্যুর আগে তার কাছে সহায়তা পৌঁছানোর ব্যবস্থাও রাষ্ট্রের থাকা উচিত।
আমরা যদি মৃত্যুর পর অপমৃত্যুর মামলা করার জন্য একটি ব্যবস্থা রাখতে পারি, তাহলে মৃত্যুর আগে একজন মানুষকে বাঁচানোর জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা কেন রাখতে পারব না?
এই প্রশ্নটি এখন আমাদের করতে হবে।
শুধু ১০ সেপ্টেম্বর নয়, ১১ সেপ্টেম্বর থেকেও।
কারণ দিবস আসে, দিবস চলে যায়। ব্যানার নামিয়ে ফেলা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট হারিয়ে যায়। কিন্তু কোনো একজন মানুষের ভেতরের যুদ্ধ থেমে যায় না।
হয়তো আজ রাতেও কোথাও একজন মানুষ একা বসে আছেন।
হয়তো তিনি কাউকে কিছু বলতে চাইছেন।
হয়তো তিনি শুধু চান, কেউ একজন তার কথা শুনুক।
সেই মানুষটির কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব আমাদের।
পরিবারের। বন্ধুর। শিক্ষকের। সমাজের। প্রতিষ্ঠানের। রাষ্ট্রের।
আত্মহত্যা প্রতিরোধের আসল জায়গাটি তাই মৃত্যুর পর নয়, মৃত্যুর আগের সেই মুহূর্তগুলোতে।
যখন মানুষটি এখনও বেঁচে আছেন।
যখন তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব।
যখন তার হাত ধরে বলা সম্ভব, “তুমি একা নও।”
এবারের বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসে তাই আমাদের শুধু গল্পটি বলতে হবে না, গল্পটিও বদলাতে হবে।
আত্মহত্যাকে শুধু একটি মৃত্যুর ঘটনা হিসেবে নয়, একজন মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট, সংকট ও সাহায্যের প্রয়োজন হিসেবে দেখতে হবে।
মৃত্যুর পর তদন্ত অবশ্যই হবে।কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, মৃত্যুর আগে মানুষটির কাছে আমরা পৌঁছাতে পেরেছিলাম কি না।
কারণ একটি অপমৃত্যুর মামলা একটি ঘটনার আইনগত সমাপ্তি ঘটাতে পারে।কিন্তু একটি জীবন বাঁচানো পারে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে।১০ সেপ্টেম্বর শুধু আত্মহত্যার বিরুদ্ধে কথা বলার দিন নয়।
এটি মানুষটি বেঁচে থাকতেই তার পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতির দিন।
আর সেই প্রতিশ্রুতি যেন ১০ সেপ্টেম্বরেই শেষ না হয়।
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন