ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশন এই সিন্ডিকেটের কারসাজির প্রমাণ!
চট্টলার কণ্ঠ ডেস্ক: রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশন এই সিন্ডিকেটের কারসাজিতে রেলের মূল্যবান যন্ত্রাংশ, মালামাল, স্লাপ চুরি ও লুটপাট দীর্ঘদিন ধরেই নানা কৌশলে এই অবৈধ কার্যক্রম চলে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে টেন্ডারের আড়ালে স্ক্র্যাপ আত্মসাৎ যেন আরও সহজ ও প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। এমনই অভিযোগ উঠেছে রেলওয়ের ‘চোরের স্বর্গরাজ্য’ হিসেবে পরিচিত সিজিপিওয়াই (CGPY) ইয়ার্ডকে ঘিরে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, পরিত্যক্ত পুরোনো যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন মূল্যবান স্ক্র্যাপ টেন্ডারের তালিকায় দেখানো পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কাগজে-কলমে নির্দিষ্ট পরিমাণ দেখালেও বাস্তবে অতিরিক্ত স্ক্র্যাপ বাইরে পাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রেলের কতিপয় লোভী কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের অনৈতিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোনো ধরনের ওজন ছাড়াই ইচ্ছেমতো স্ক্র্যাপ পাচার করা হচ্ছে। সম্প্রতি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশন এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত মালামাল নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি বিক্রি নিষিদ্ধ রিক্লেইমেবল (পুনঃব্যবহারযোগ্য) পার্টসও পাচার করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সূত্র জানায়, ওজনে কারচুপির কারণে এবারই প্রথম সার্ভে করা জুনাপে বিপুল ঘাটতি দেখা গেছে। জুনাপ ঘাটতির বিষয়টি লিখিতভাবে কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন ঠিকাদার। তবে ঠিক কত পরিমাণ মালামালের ঘাটতি রয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি।
স্ক্র্যাপ ঘাটতির বিষয়ে চিঠির কথা স্বীকার করে জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (ডিসিওএস) মো. আলমগীর কবির বলেন, “সার্ভে করা মালামালের ওজন কম হয়েছে-এ মর্মে ঠিকাদারের পক্ষ থেকে সিওএসকে
একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমরা বিষয়টি দেখছি।” সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানায়, মালামালের ওজন নির্ধারণে ৬০ পর্যায়ের অভিন্ন সাত্রে কমিটি থাকে। নষ্টতাওয়াবা কাটিংয়ের ফলে যে গরিমার মাল কমবে, সেটিও হিসাবের মধ্যে ধরা হয়। এমনকি বাস্তবের তুলনায় কম হিসাব করা হয়। ফলে অতিমাত্রায় চুরি না হলে স্ক্র্যাপ কম হওয়ার কথা নয়।
জানা গেছে, টেন্ডারের মাধ্যমে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ব্যবহার অনুপযোগী ৭৬৫ টন স্ক্র্যাপ ক্রয়ের কার্যাদেশ পায় অবৈধ পার্কিং দখল, কেটারিং সার্ভসে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা, টেন্ডার ভাগিয়ে নেয়া, স্টে-অর্ডার এর নামে হাজার কোটি টাকার রেলের সম্পত্তি নিজের দখলে রাখাসহ নানান কাজে বিতর্কিত ঠিকাদার মো. শাহ আলমের মালিকানাধীন এস এ কর্পোরেশন। গত ২২ সেপ্টেম্বর ওইসব মালামাল ডেলিভারি নেওয়ার জন্য জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক মো. আলমগীর কবির একটি চিঠি ইস্যু করেন। চিঠিতে বলা হয়, কার্যাদেশ ও সার্ভে শিট অনুযায়ী যেখানে যে অবস্থায় রয়েছে, সেখানে ওজন করে ‘এমটন’ হিসেবে ডেলিভারি নিশ্চিত করতে হবে। সেল অর্ডারে বিক্রিত মালামালের ওজনে কম-বেশি হলে ফিডবুকে স্বাক্ষর ও লিপিবদ্ধ করতে হবে এবং ওজনের স্থিরচিত্র সংরক্ষণ করতে হবে। ওজনের সময় আরএনবি, টিএক্সআর, হিসাব শাখা ও ঠিকাদারের প্রতিনিধির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। কিন্তু এসব বিধি অনুসরণ না করে ওজন ছাড়াই মালামাল ডেলিভারি কর হয়েছে বলে একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সূত্র জানায়, বিক্রিত মালামাল গত ২৭ নভেম্বর থেকে ডেলিভারি নেওয়া শুরু হয়। মোট ১২২টি ওয়াগনের মধ্যে সিজিপিওয়াই ও এসআরবিতে রয়েছে ১৬টি ওয়াগন। এসব ওয়াগনের কিছু মালামাল পুনঃব্যবহারযোগ্য পার্টস হিসেবে বিবেচিত, যেগুলো রিক্লেইমেবল পার্টস। যেমন-বগি ফ্রেম, চাকা ও এক্সেল বক্স, ব্রেক বিম, লাগেজ ডুফ, রকার বার, সুইং হ্যাঙ্গার, সোয়ান নেক, এক্সেল গার্ড ওয়েব, বগি
সেন্টার পিভট, ব্রেক শ্যাফ্ট, ভ্যাকুয়াম সিলিন্ডার, ট্রেন পাইপ, বাফার কাপলিংসহ ওয়াগন ও কোচের নিচের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।
এসব পার্টস বিক্রির অন্তর্ভুক্ত নয়। এগুলো পুনঃব্যবহারযোগ্য না হলেও সাধারণ এমএস লোহার তুলনায় দাম অনেক বেশি হওয়ায় আলাদা লটে বিক্রির জন্য সংরক্ষণের নিয়ম রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে, সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডের হেড টিএক্সআর জাকির হোসেন বলেন, “আমাদের ওজনঘরটি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট থাকায় ইয়ার্ডের ভেতরে ওজনের সুযোগ নেই। তাই বাইরে একটি প্রাইভেট স্কেলে ওজন করা হয়।”
বর্তমানে পুরোনো লোহার বাজারদর প্রতি টন সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা। অথচ রেলওয়ে থেকে এস এ কর্পোরেশন স্ক্র্যাপ কিনছে প্রায় ৭০ হাজার টাকায় (ভ্যাট ও ট্যাক্সসহ)। ফলে এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে রেলের একটি চক্র অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে। ঠিকাদারকে সহযোগিতা করছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে, জেলা সরঞ্জাম ক্রয় কর্মকর্তা আল আমিন বলেন, “রিক্লেইমেবল পার্টসের মধ্যে যেগুলো ব্যবহার অনুপযোগী, সেগুলো ঠিকাদার নিয়ে যাচ্ছে। আর ব্যবহারযোগ্যগুলো রেখে দেওয়া হচ্ছে।”
সিজিপিওয়াই ইয়ার্ড থেকে ওজন স্কেলের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। এ পথে ট্রাকে লোড করা মূল্যবান যন্ত্রাংশ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি মুচকি হেসে বলেন, “কোনো রকম হেল্প লাগলে বলবেন, শাহ আলম ভাই খুব ভালো মানুষ।” এ বিষয়ে জানতে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারী মো. শাহ আলমের মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। সূত্র: দেশ বার্ত।
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন