চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানাধীন এলাকায় সংঘটিত দুটি আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং ধারাবাহিক বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে উভয় ঘটনার সঙ্গে জড়িত আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার ১৮ জুন বিকালে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম।
নিখোঁজ শিশু জায়হান হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন:
গত ১৬ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ তারিখে পটিয়া পৌরসভার দক্ষিণ গোবিন্দারখীল এলাকার বাসিন্দা মুহাম্মদ শাহজাহান তার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মোঃ জায়হান নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে পটিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে পটিয়া থানা পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করে এবং সারা দেশে বেতার বার্তার মাধ্যমে শিশুটির সন্ধান চাওয়া হয়।
নিখোঁজ শিশুকে উদ্ধারের লক্ষ্যে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও পটিয়া থানা পুলিশের সমন্বয়ে একাধিক বিশেষ আভিযানিক টিম গঠন করা হয়। টিমগুলো শিশুটির আত্মীয়-স্বজন, পরিচিতজন ও সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক অনুসন্ধান পরিচালনা করে। অনুসন্ধান চলাকালে শিশুটির পরিবারের বসতঘরে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির রেখে যাওয়া মুক্তিপণ ও হুমকিমূলক একটি চিরকুট উদ্ধার হয়, যা তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করে।
চিরকুটটির লেখা বিশ্লেষণ, ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, বিভিন্ন আলামত এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত করে।
সাদিয়া সুলতানা নিহা (১৯)- পিতা- সাইফুদ্দিন, পটিয়া শেভরন হাসপাতালে নার্স হিসেবে কাজ করতেন। পটিয়া পৌরসভার দক্ষিণ গোবিন্দারখীল এলাকার বাসিন্দা মুহাম্মদ শাহজাহান সাদিয়া সুলতানা নিহা (১৯) এর প্রতিবেশী বড় ভাই হয়। একপর্যায়ে সাদিয়া সুলতানা নিহা (১৯ এর হাতের লেখার সঙ্গে উদ্ধারকৃত চিঠির লেখার সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। পরবর্তীতে তাকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটিত হয়।
তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে শিশুটিকে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে অভিযুক্তদের দেখানো মতে ১৮ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ রাত আনুমানিক ৩:২০ ঘটিকায় তাদের বসতঘরের পেছনে নর্দমার ময়লার মধ্যে লুকিয়ে রাখা বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় জড়িত তিনজনকে আটক করা হয়েছে। মরদেহ উদ্ধার শেষে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতপূর্বক ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত মামলার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
পঙ্কজ শীল হত্যা ও তিলক চক্রবর্তীকে হত্যাচেষ্টা মামলায় দুই আসামি গ্রেফতার।
গত ০৯ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ তারিখে পটিয়া থানাধীন চক্রশালা এলাকায় সংঘটিত পঙ্কজ শীল হত্যা ও তিলক চক্রবর্তীকে হত্যাচেষ্টা মামলাটি এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। ঘটনার পরপরই পটিয়া থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) সমন্বিতভাবে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে।
তদন্তে জানা যায়, চক্রশালা এলাকার একটি সড়কে সন্দেহজনকভাবে অবস্থানরত এক নারী ও এক পুরুষকে জিজ্ঞাসাবাদকে কেন্দ্র করে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে পঙ্কজ শীল ও তিলক চক্রবর্তীর ওপর এলোপাতাড়ি হামলা চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় পঙ্কজ শীলকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
অপরদিকে গুরুতর আহত তিলক চক্রবর্তী বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে আসামিদের পরিচয় শনাক্ত করে। পরবর্তীতে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযানের ধারাবাহিকতায় গত ১৭ জুন টেকনাফ থানা পুলিশের সহযোগিতায় টেকনাফ এলাকা থেকে মোঃ আব্দুল রহমান (২৩)-কে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে ১৮ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ চন্দনাইশ এলাকা থেকে ফাতেমা বেগম নেহা (১৯)-কে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনার সময় আসামিদের পরিহিত পোশাক জব্দ করা হয়েছে, যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পেশাদার, প্রযুক্তিনির্ভর ও নিরলস তদন্ত কার্যক্রমের ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে দুটি আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয়েছে। জেলা পুলিশের সমন্বিত গোয়েন্দা তৎপরতা, তথ্যপ্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ে ধারাবাহিক অভিযানের মাধ্যমে অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অপরাধ দমন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন