চট্টলার কণ্ঠ ডেস্কঃ চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ এলাকায় নৃত্যের তালে তালে গান গেয়ে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের পলাতক আসামি মেহেদী হাসান সাগর এবং মোঃ শান্ত’কে গ্রেফতার করেছে র্যাব-৭। গতকাল রবিবার ৬ অক্টোবর দুপুরে চট্টগ্রাম মহানগরীর খুলশী থানাধীন গরীবুল্লাহ শাহ মাজারের সামনে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক কয়রা হয়। আটককৃত আসামীরা হলেন, খুলশী থানাধীন গরীবুল্লাহ সাহেব ডোবারপাড় এলাকার এমএস দুলাল এর ছেলে মেহেদী হাসান সাগর (২৮) ও একই এলাকার নুর ইসলাম এর ছেলে মোঃ শান্ত (২৮)।
র্যাব জানায়, নিহত ভিকটিম মোঃ শাহাদাত হোসেন (২৪) নোয়াখালী জেলার মৃত হারুনের ছেলে। সে চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানা এলাকায় তার স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছিল এবং বিআরটিসি ফলমন্ডিতে চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিল। গত ১৩ আগস্ট দুপুরে প্রতিদিনের ন্যায় ভিকটিম মোঃ শাহাদাত হোসেন তার ভাড়া বাসা হতে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বাহির হয়। ঐ দিন সন্ধ্যায় ভিকটিম মোঃ শাহাদাত হোসেনকে তার স্ত্রী ফোন করে বাসায় আসতে বললে সে কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় আসবে বলে জানায়। পরবর্তীতে ভিকটিম মোঃ শাহাদাত হোসেন বাসায় ফিরে না আসায় এবং তার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার স্ত্রী সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থান সহ আত্মীয় স্বজনের বাসায় খোঁজাখুঁজি করে তার কোন সন্ধান পায়নি। পরবর্তীতে গত ১৪ আগস্ট ভিকটিমের চাচা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে দেখতে পান যে, তার ভাতিজা মোঃ শাহাদাত হোসেন মৃত অবস্থায় চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ মডেল থানাধীন বদনা শাহ্ মাজার সংলগ্ন সিএসসিআর হাসপাতালের সামনে রাস্তার উপর পড়ে আছে। পরবর্তীতে নিহত ভিকটিমের স্ত্রী, চাচা এবং পাঁচলাইশ মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ভিকটিম মোঃ শাহাদাত হোসেনকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। উক্ত ঘটনায় ভিকটিমের চাচা বাদী হয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ থানায় আজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন।
গত ২১ সেপ্টেম্বর এক যুবককে দুই হাত বেঁধে গান গেয়ে নাচের তালে তালে উচ্ছৃঙ্খল কিছু জনতার মারধরের একটি ভিডিও পুলিশের নজরে আসে। ঘটনাটি গত ১৪ আগস্টের হলেও জানাজানি হয় গত ২১ সেপ্টেম্বর। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, মোঃ শাহাদাত হোসেনের দুই হাত দুই পাশে স্টিলের পাইপের সঙ্গে বেঁধে কিছু যুবক গান গেয়ে গেয়ে তাকে মারধর করছে। সেই ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে থানা পুলিশ জানতে পারে যে, মারধরের শিকার হতভাগ্য যুবকের নাম শাহাদাত হোসেন। নিহত শাহাদাত হোসেনের স্ত্রীকে থানায় ডেকে পাঠানো হয়। ভিকটিমের স্ত্রী থানায় এসে ঐ ভিডিও দেখে ভিডিও চিত্রের যুবকটি তার স্বামী বলে শনাক্ত করেন।
র্যাব-৭ এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) শরীফ উল আলম এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, মেহেদী হাসান সাগরকে নগরের খুলশী থানাধীন গরীবুল্লাহ শাহ মাজারের সামনে থেকে গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে খুলশী থানাধীন জামতলা এলাকা থেকে শান্তকে গ্রেফতার করা হয়।।
তিনি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা শাহাদাত হোসেনকে হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। বলেছে, গত ১৩ আগস্ট আসামি মেহেদী হাসান সাগর ভুক্তভোগী শাহাদাত হোসেনকে মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে যায়। পরে তাকে অপহরণ করে ভুক্তভোগীর স্ত্রীর কাছে মুক্তিপণ দাবি করেছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে।
এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তিন জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (পিআর) কাজী তারেক আজিজ বলেন, ‘গত ১৩ আগস্ট রাত ১০টা থেকে ১৪ আগস্ট রাত দেড়টার মধ্যবর্তী সময়ে ২ নম্বর গেট ট্রাফিক পোস্টের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে বেধড়ক মারপিট করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ভিকটিম শাহাদাতকে।’হত্যার পর গত ১৩ আগস্ট রাতের অন্ধকারে শাহাদাতকে পাঁচলাইশ থানাধীন বদনাশাহ মাজার সংলগ্ন রাস্তার সামনে অজ্ঞাত লোকজন ফেলে চলে যায়। পাঁচলাইশ থানা পুলিশ ১৪ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় লাশটি উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পাঁচলাইশ থানা পুলিশ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করে। বর্বরোচিত ও নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ গত ২১ আগস্ট থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রচারিত হলে তা ভাইরাল হয়।
নিহত শাহাদাত হোসেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানার পাঁচবাড়িয়া ইউনিয়নের নদনা গ্রামের মৃত মোহাম্মদ হারুনের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে স্ত্রী ও মাকে নিয়ে বিআরটিসি এলাকার বয়লার কলোনিতে থাকতেন তিনি। এ ঘটনায় নিহতের চাচা হারুন ১৫ আগস্ট অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ১৩ আগস্ট বেলা ২টার দিকে কর্মস্থলের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হন শাহাদাত। সন্ধ্যা ৭টার দিকে ফোন করলে কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় চলে আসবেন বলে স্ত্রীকে জানান। গভীর রাত পর্যন্ত বাসায় ফিরে না আসায় খোঁজাখুঁজি করেন স্ত্রী শারমিন। এ সময় শাহাদাতের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ১৪ আগস্ট রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফেসবুকে বাদী হারুন দেখতে পান, নগরের প্রবর্তক মোড়ের অদূরে সিএসসিআর হাসপাতালের সামনের সড়কের পাশে ভাতিজা শাহাদাতের লাশ পড়ে আছে।
এর আগে রাত ৯টার দিকে খবর পেয়ে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে শাহাদাতকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের (চমেক) জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। ওই দিন রাতেই চমেক হাসপাতালে গিয়ে পুলিশের উপস্থিতিতে শাহাদাতের লাশ শনাক্ত করেন স্ত্রী শারমীন এবং মামলার বাদী হারুন। সেদিন রাতে মৃত অবস্থায় শাহাদাতকে হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন বাদী।
গ্রেফতারকৃত আসামিদের চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ থানা পুলিশের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে।
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন