১ অক্টোবর আর্ন্তজাতিক প্রবীণ দিবস। জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিনটি কেবল বয়স উদযাপনের দিন নয়, বরং আমাদের সম্মিলিত বিবেকের আয়না। প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন, তাঁরা আমাদের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার জীবন্ত ভান্ডার। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ”দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা” আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, কিন্তু সেই বাড়তি বছরগুলো কি মর্যাদাপূর্ণ হচ্ছে?বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৬২ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯.৫ শতাংশ। জাতিসংঘের প্রক্ষেপণ বলছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে এই হার ১২ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনে একজন হবেন প্রবীণ। আমরা জনসংখ্যার লভ্যাংশের কথা বলছি, কিন্তু বার্ধক্যের যে সুনামি আসছে, তার জন্য আমাদের প্রস্তুতি কি আছে?
বাংলাদেশসহ বিশ্বে আজ অতি বয়স্ক প্রবীণ জনগোষ্ঠী দ্রুত বাড়ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে আমরা দীর্ঘায়ু পেয়েছি, কিন্তু একাকীত্ব, অবহেলা আর নিরাপত্তাহীনতা সেই অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। শহুরে ব্যস্ত জীবনে প্রবীণ বাবা-মা অনেক সময়ই পরিবারের প্রান্তে ঠাঁই পান। গ্রামে সন্তানরা শহরমুখী হওয়ায় একা পড়ে থাকেন বহু বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। তাঁদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়বহুল, মানসিক স্বাস্থ্যের কথা কেউ ভাবে না, আর ডিজিটাল যুগে তাঁরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছেন।আমাদের সমাজে প্রবীণদের নিয়ে একটি সুন্দর ধারণা আছে- দাদুর কোলে নাতি, যৌথ পরিবারের বটবৃক্ষ। সেই চিত্রটি এখন ক্ষয়িষ্ণু।
প্রবীণদের বাস্তবতা এখন তিন ভাগে ভাগ হয়ে গেছে, এবং তিনটিই উদ্বেগজনক।
প্রথম বাস্তবতা: পরিবার কাঠামোর পরিবর্তন ও নিঃসঙ্গতা।এক সময় গ্রামীণ যৌথ পরিবার ছিল প্রবীণের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়। এখন নগরায়ণ, অভিবাসন এবং একক পরিবারের প্রসারে সেই আশ্রয় ভেঙে পড়েছে। ঢাকায় কর্মজীবী দম্পতির বাসায় বৃদ্ধ বাবা-মা সারাদিন একা ফ্ল্যাটে থাকেন। কথা বলার মানুষ নেই, বারান্দাই তাঁদের পৃথিবী। গ্রামের চিত্রসম্পূর্ণ উল্টো-সন্তানেরা থাকে ঢাকা বা বিদেশে, প্রবীণরা একা ভিটে আগলে আছেন নিরবে নিভৃত্বে শুনসান পরিবেশে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শহরে ৬৮ শতাংশ প্রবীণ কোনো না কোনো মাত্রায় একাকিত্ব ও বিষন্নতায় ভোগেন। এই নিঃসঙ্গতা কেবল মানসিক নয়, এটি তাঁদের মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ায়। ঈদে-পূজায় সন্তানের বাড়ি ফেরার অপেক্ষার প্রহর গুনে নিরন্তর কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয় না ঘরে ফেরা – এই গল্প এখন হাজারো ঘরের।
দ্বিতীয় বাস্তবতা: ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ও অপ্রতুল সেবা।বার্ধক্য মানেই বহু রোগের সহবস্থান।উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, বাত, চোখের ছানি, ডিমেনশিয়া। কিš‘ আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখনো কেবলমাত্র শিশু ও তরুণদের জন্য তৈরি। দেশের কোনো সরকারি মেডিকেল কলেজে পূর্ণাঙ্গ জেরিয়াট্রিক বিভাগ নেই।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নামমাত্র একটি ইউনিট আছে, যেখানে মাসের পর মাস সিরিয়াল দিতে হয় যা এক ধরণের অনাকাংখিত সময়ক্ষেপণ ও প্রবীণের জীবনঝুঁকি বাড়ায়।উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে একজন ৭০ বছরের মানুষ ডায়াবেটিসের ওষুধ ঠিকমতো পান না তাঁকে জেলা শহরে যেতে হয়। চোখের ছানিঅপারেশনের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা। সবচেয়ে কষ্টকর হলো ডিমেনশিয়া বা পারকিনসন রোগীদের জন্য। পরিবার বোঝেই না এটি রোগ, ভাবে বয়সের ভিমরতি। ফলে তাঁরা অবহেলা, এমনকি দুর্ব্যবহারের শিকার হন। একজন প্রবীণকে মাসে গড়ে ২৫০০ থেকে ৪০০০ টাকার ওষুধ কিনতে হয়, যেখানে তাঁর কোনো আয় নেই। দুমুঠো ভাত জোগার করাই যেখানে কঠিন সেখানে এত টাকার ঔষধ ক্রয় মরার উপর খারার ঘাঁ এর মত হয়।
তৃতীয় বাস্তবতা: আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা ও নারী প্রবীণের কষ্টদ্বিগুণ হয় ।বাংলাদেশে মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক পেনশনের আওতায়। বাকি ৮৫ শতাংশ, বিশেষ করে কৃষক, শ্রমিক, গৃহিণী-তাঁদের বার্ধক্য পুরোপুরি সন্তানের দয়ার ওপর নির্ভরশীল। সরকার বয়স্ক ভাতা দেয় ৬০০টাকা। এই টাকায় এখন এক বস্তা চালও হয় না। আর এই ভাতা পান মাত্র ৫৮ লাখ মানুষ, বাকিরা তালিকার বাইরে-থাকায় প্রায় ১ কোটি প্রবীণ সরকারের সেফটি নেটওয়ার্কের বাহিরে থাকে।এর মধ্যে সবচেয়ে করুণ অবস্থা প্রবীণ নারীদের। পুরুষের তুলনায় নারীরা গড়ে বেশি দিন বাঁচেন, ফলে বিধবা প্রবীণের সংখ্যা অনেক বেশি। তাঁদের নিজের নামে জমি নেই, সঞ্চয় নেই, স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁরা অনেক সময় পরিবারে বাড়তি মানুষ হিসেবে গণ্য হন। সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা, ভাতার টাকা কেড়ে নেওয়া-এই নির্যাতনের খবর পত্রিকার পাতায় প্রায়ই আসে।
পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন -২০১৩ আছে, কিন্তু এর প্রয়োগ নেই । কয়জনবাবা-মা সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন? লোকলজ্জা ও আইনি জটিলতায় এটি আইন কাগজেই রয়ে গেছে বাস্তবে তা অতীব নগন্য।তাহলে করণীয় কী? প্রবীণ দিবসে শুধু সেমিনার আর ক্রেস্ট বিতরণ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। বয়স্ক ভাতাকে সর্বজনীন ও বাস্তবসম্মত করতে হবে। ৬০০ টাকা নয়, অন্তত ১৫০০ টাকা এবং ৬৫ বছরের বেশি সব দরিদ্র নাগরিককে এর আওতায় আনতে হবে। ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে ডিজিটাল হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আমুল পরিবর্তন আনতে হবে। প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার জেরিয়াট্রিক ওয়ার্ড, উপজেলায় প্রবীণ কর্ণার এবং প্রবীণের জন্য বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকা করতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিকে রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস মাপার সঙ্গে ডিমেনশিয়া স্ক্রিনিং যোগ করতে হবে। এছাড়াও প্রবীণবান্ধব নগর ও পরিবহণ করতে হবে। ফুটপাত, পার্ক, বাস, সরকারি অফিস-কোথাও প্রবীণদের জন্য বসার জায়গা, অগ্রাধিকার কাউন্টার নেই। ঢাকার মতো শহরে প্রবীণদের জন্য নিরাপদ হাঁটার পার্ক এবং প্রতিটি ওয়ার্ডে ডে-কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে তাঁরা দিনের কিছু সময় কাটাতে পারবেন, সাথে সঙ্গীও পাবেন। সবশেষে প্রবীণদের কার্যক্ষমতা কাজে লাগানো একান্ত প্রয়োজন। অবসর মানে অকেজো নয়। তাঁদের অভিজ্ঞতাকে কৃষি পরামর্শ, প্রাথমিক শিক্ষায়, সালিশ-মীমাংসা এবং কমিউনিটি মেন্টর হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সরকারি-বেসরকারি খাতে ’প্রবীণ ইন্টারশিপ’ বা খন্ডকালীন কাজের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। রাষ্ট্র সব করবে না। সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে, বাবা-মায়ের বার্ধক্য মানে তাঁদের দ্বিতীয় শৈশব। তাঁদের জন্য সময়, ধৈর্য্য এবং সম্মান-এটাই সবচেয়ে বড় ভাতা। পরিবারের সকল সদস্যকে প্রবীণের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।
নতুন ভাবনা মানে শুধু ভাতা বা দিবসভিত্তিক সম্মাননা নয়। এর অর্থ হলো প্রবীণবান্ধব সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা। স্বাস্থ্য কেন্দ্রে জেরিয়াট্রিক সেবা নিশ্চিত করা, গণপরিবহণ ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রবীণদের চলাচল সহজ করা, পেনশন ও সামাজিক নিরাপত্তা জোড়দার করা, এবং সর্বোপরি তাঁদের কর্মক্ষমতাকে কাজে লাগানো। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, কৃষক বা কারিগর চাইলেই পরামর্শক, প্রশিক্ষক বা স্বে”ছাসেবী হিসেবে সমাজে অবদান রাখতে পারেন। তাঁদের ”অচল” ভাবার মানসিকতাই সবচেয়ে বড় বাধা।পরিবারেও নতুন ভাবনার প্রয়োজন। প্রবীণদের সঙ্গে সময় কাটানো, তাঁদের কথা মন দিয়ে শোনা, প্রযুক্তি শেখাতে ধৈর্য্য ধরা, এগুলোই প্রকৃত সম্মান। রাষ্ট্রের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। আন্ত:প্রজন্ম সংলাপ বাড়লে ভাঙবে দুরত্ব, গড়বে সেতুবন্ধন।
একটি সভ্যতার মান বিচার হয় সে তার শিশু ও প্রবীণদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তা দিয়ে। আজকের তরুণরাই আগামীকালের প্রবীণ। আজ আমরা প্রবীণদের জন্য যে পৃথিবী তৈরি করব, কাল আমাদেরও সেই পৃথিবীতেই থাকতে হবে। নিঃসঙ্গ বার্ধক্য নয়, আমরা মর্যাদার বার্ধক্য চাই। দীর্ঘ জীবন আর্শীবাদ, যদি সেই জীবন হয় সুস্থ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ। এবারের প্রবীণ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক: কোনো প্রবীণ যেন অবহেলায় একাকীতে দিন না কাটান। তাঁদের জন্য নতুন করে ভাবি, নতুন করে গড়ি, কারণ আজকের তরুণই আগামীর প্রবীণ।
অধ্যাপক ড. দিলীপ কুমার সাহা
প্রাক্তন অধ্যক্ষ,
সরকারি ভিকু মেমোরিয়াল কলেজ, মানিকগঞ্জ।
You must be logged in to post a comment.
আপনার মতামত দিন