
সুজন ভট্টাচার্য্য,বিশেষ প্রতিনিধিঃখাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার দুর্গম ধনিরামপাড়ায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সৌজন্যে যৌথ মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল অনুষ্ঠিত এ ক্যাম্পে দুর্গম এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টি ও নিরাপদ খাদ্য প্রস্তুত বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
যৌথ এ মেডিকেল ক্যাম্পে গ্রাউস (GRAUS), জাবারাং কল্যাণ সমিতি ও ব্র্যাক হেলথ অংশগ্রহণ করে। ক্যাম্পে স্থানীয় জনগণকে চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্য পরামর্শ প্রদানের পাশাপাশি শিশুদের সুষম খাদ্য, পরিপূরক খাবার এবং নিরাপদ খাদ্য প্রস্তুত বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের জন্য পরিপূরক খাবার (Complementary Food) হিসেবে সুজি ও খিচুড়ি তৈরির ব্যবহারিক প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে শিশুদের জন্য সহজলভ্য ও স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় এমন উপকরণ ব্যবহার করে কীভাবে পুষ্টিকর খাবার তৈরি করা যায়, তা হাতে-কলমে দেখানো হয়।
এ সময় খাদ্য তৈরির আগে ও পরে হাত পরিষ্কার রাখার গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। রান্না শুরু করার আগে, শিশুর খাবার প্রস্তুত করার আগে এবং শিশুকে খাওয়ানোর আগে সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়ার সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে অভিভাবকদের ধারণা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে শিশুর পায়খানা পরিষ্কার করার পর এবং রান্নাঘরের অপরিষ্কার কোনো বস্তু স্পর্শ করার পর পুনরায় হাত ধোয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। এতে খাবারে জীবাণুর সংক্রমণ কমানো এবং শিশুদের ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে সচেতন করা হয়।
ব্যবহারিক প্রদর্শনীতে সবজি পরিষ্কার ও কাটার সঠিক পদ্ধতিও দেখানো হয়। প্রথমে পরিষ্কার পানিতে সবজি ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া, এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী কেটে রান্না করা এবং দীর্ঘ সময় পানিতে ভিজিয়ে না রাখার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়। সবজি কাটার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ছোট করে বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে কেটে না ফেলে শিশুর উপযোগী আকারে কাটার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাতে খাবারের পুষ্টিমান যতটা সম্ভব বজায় থাকে।
এছাড়া রান্নার সময় কোন উপকরণ কখন দিতে হবে এবং কীভাবে রান্না করলে খাবারের পুষ্টিগুণ ভালোভাবে বজায় থাকে, সে বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। খিচুড়ি তৈরির সময় চাল, ডাল, তেল ও বিভিন্ন সবজির সমন্বয় করে শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী নরম ও সহজে খাওয়ার উপযোগী খাবার প্রস্তুতের পদ্ধতি দেখানো হয়। খাবারে তেল ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা এবং বিভিন্ন খাদ্য উপাদান একসঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে শিশুর জন্য শক্তি, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজের চাহিদা পূরণে কীভাবে সহায়তা করে, তাও ব্যাখ্যা করা হয়।
অন্যদিকে, সুজি তৈরির সময় প্রয়োজনীয় উপকরণ সঠিকভাবে ব্যবহার, পরিমাণ অনুযায়ী রান্না এবং শিশুর বয়স অনুযায়ী খাবারের ঘনত্ব ঠিক রাখার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। রান্না শেষে খাবার শিশুর খাওয়ার উপযোগী তাপমাত্রায় এনে পরিবেশনের বিষয়েও অভিভাবকদের পরামর্শ দেওয়া হয়।
প্রদর্শনী শেষে শিশুদের জন্য সুজি ও খিচুড়ি রান্না করে সরাসরি খাওয়ানো হয়। এসব খাবারে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান এবং শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশে এর ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। বিশেষ করে খিচুড়িতে চাল ও ডাল থেকে পাওয়া শর্করা ও প্রোটিন, তেল থেকে পাওয়া শক্তি এবং বিভিন্ন সবজি থেকে পাওয়া ভিটামিন ও খনিজের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে মাটিরাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (UH&FPO) ডা. শোভন দত্ত শিশুদের সঠিক সময়ে পরিপূরক খাবার দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ছয় মাস বয়সের পর মায়ের দুধের পাশাপাশি শিশুর বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় পরিপূরক খাবার দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পুষ্টি শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি, শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পুষ্টি বিষয়ক এ সেশনের কার্যক্রম মাটিরাঙ্গা উপজেলা কো-অর্ডিনেটর মো. মঈনুদ্দিন রাজু মনিটরিং করেন। তিনি শিশুদের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার পাশাপাশি খাদ্য প্রস্তুতের প্রতিটি ধাপে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, বিশেষ করে সঠিক নিয়মে হাত ধোয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় অংশগ্রহণকারী এলাকা বাসী এ ধরনের জনকল্যাণমূলক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জাবারাং কল্যাণ সমিতিকে ধন্যবাদ জানান। দুর্গম এলাকার শিশু ও পরিবারের জন্য এ ধরনের কার্যক্রম নিয়মিত আয়োজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, যৌথ মেডিকেল ক্যাম্পের পাশাপাশি এ ধরনের ব্যবহারিক পুষ্টি প্রদর্শনী দুর্গম এলাকার অভিভাবকদের মধ্যে শিশুদের পুষ্টি, নিরাপদ খাদ্য প্রস্তুত, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও সঠিক হাত ধোয়ার বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : K. Chy