
আফজাল হোসেন জয়: লামা (বান্দরবান) প্রতিনিধি।বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাইতং উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জসিম উদ্দীনের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের এক নারী কর্মচারীকে যৌন হয়রানির চেষ্টা, কুপ্রস্তাব প্রদান, কর্মক্ষেত্রে হেনস্তা এবং চাকরি-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের অজুহাতে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে কুপ্রস্তাব দেওয়ারও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিন ধরে হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে নিরুপায় হয়ে গত ১৯ সেপ্টেম্বর ভুক্তভোগী ওই নারী কর্মচারী লামা থানায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। বিষয়টি নিয়ে বিদ্যালয় ও স্থানীয় অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ, ২০২২ সালে ফাইতং উচ্চ বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে যোগদানের পর থেকেই প্রধান শিক্ষক মো. জসিম উদ্দীন তাকে বিভিন্নভাবে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছেন। তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যার সুযোগ নিয়ে প্রধান শিক্ষক চকরিয়ায় তার বাসায় গিয়ে অনৈতিক সম্পর্কের প্রস্তাব দিতেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, এসব প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় কর্মক্ষেত্রে তাকে নানাভাবে হয়রানি ও হেনস্তা করা হয়। এমনকি বিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মী ও নৈশপ্রহরীদের মাধ্যমে তাকে চুরির অপবাদ দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি তার।
অভিযোগে আরও বলা হয়, চাকরির ইএফটি (EFT) সম্পন্ন করা, আইডি কার্ডে বয়স সংশোধন, এমপিও ফাইল পাঠানো এবং বেতন নিশ্চিত করে দেওয়ার কথা বলে প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন সময়ে তার কাছে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা করে দাবি করতেন। ভুক্তভোগীর দাবি, বাধ্য হয়ে তিনি বিভিন্ন সময়ে কিছু টাকা দিলেও পরবর্তীতে নিজের প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করতে তাকে নিজ খরচে ঢাকায় যেতে হয়েছে।
সর্বশেষ গত ১২ সেপ্টেম্বর বিকেলে বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে প্রধান শিক্ষক জসিম উদ্দীন তাকে অশালীন মন্তব্য করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী আরও জানান, বেতন বন্ধ থাকার সময় প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে নেওয়া ১৫ হাজার টাকা ধার ফেরত দেওয়ার বিষয়কে কেন্দ্র করে তার কাছ থেকে ১০ পাতার একটি খালি চেক ও সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে চেকটি ফেরত দেওয়া হলেও সাদা কাগজটি ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় পরিবারের পরামর্শে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে জানান ওই নারী কর্মচারী।
অভিযোগের বিষয়ে ভুক্তভোগী নারীর সাথে মুঠো ফোনে কথা হলে তিনি জানান "ফাইতং উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকে এমন কোন দিন নেই, জসিম উদ্দীন আমাকে হেনস্থা করেনি।তিনি আরো বলেন, তিনি আমার পারিবারিক অবস্থার কথা জানতেন তাই সে সুযোগ টা কে ব্যবহার করে ক্রমাগত আমাকে কূ প্রস্তাব দিতে থাকেন,তবুও আমার সন্তানের দিকে তাকিয়ে আমি সবকিছু নিরবে সহ্য করে গেছি।সবশেষ তিনি যে ধরনের বাজে প্রস্তাব দিয়েছিলেন সেটা আমি আর সহ্য করতে পারনি এবং জীবন বাজী রেখে থানায় গিয়ে অভিযোগ করেছি। ভুক্তভোগী বলেন, আমি চেয়েছিলাম থানায় অভিযোগের বিষয় টা কেউ না জানুক পরে দেখলাম বিষয় টা জানাজানি হয়ে গেছে, তবে জানাজানি হবার কারণে বেশ ভালো হয়েছে বলে জানান তিনি।"
এই বিষয়ে ফাইতং পুলিশ ফাঁড়ির আই সি হিমেল রায় এর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, "একটা লিখিত অভিযোগ আমার কাছে এসেছে। এর বেশি কিছু আমি...... এর বেশি কিছু জানতে চাইলে আপনি (সাংবাদিক) একটু ওসি স্যার কে ফোন দেন।"
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে, ফাইতং উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অভিযুক্ত জসিম উদ্দীন বলেন, "আমার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ দায়ের কথা আমি শুনেছি, তবে অভিযোগে কি কি আছে সেগুলো আমি কিছুই জানিনা। তিনি আরো বলেন, বিষয় টা পুলিশ দেখতেছে, তো তারা দেখুক, এর বাইরে আমার কিছু বলার নেই।"
লামা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মিঠু চট্টোপাধ্যায় এর সাথে এবিষযে কথা হলে তিনি জানান, প্রধান শিক্ষক জসিম উদ্দীনের বিরুদ্ধে গত কয়েকদিনে ৩ টি অভিযোগ জমা পড়েছে।
এসব অভিযোগ গুলো তদন্তের জন্য আগামী ৭ অক্টোবর তাকে ডাকা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে লামা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ কাইছার হামিদ বলেন, "ফাইতং উচ্চ বিদ্যালয়ে কর্মরত একজন নারী লামা থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন, আমি অভিযোগটি তদন্ত করে দেখার জন্য আইসি ফাইতং কে দায়িত্ব দিয়েছি।"
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রধান শিক্ষক জসিম উদ্দীনের বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন সময়ে অনৈতিক আচরণ, শিক্ষার্থীদের কুপ্রস্তাব দেওয়া, বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাৎ এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের মতো অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীকে কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও ছিল। ২০২৬ সালেও একই ধরনের অভিযোগ ওঠার কথা তারা উল্লেখ করেছেন। এসব ঘটনায় অতীতে তিনি কারাভোগ করেছেন বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।
এদিকে, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেক অভিভাবক। তারা অভিযোগ গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা উদঘাটন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : K. Chy