
লামা (বান্দরবান) প্রতিনিধি।বান্দরবানের লামা উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের ক্যাম্প বাজার থেকে বাছুরিপাড়া হয়ে পূর্বচাম্বী মুসলিম পাড়া পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সড়কটির কাজে বালুর পরিবর্তে পাহাড়ের লাল মাটি, এলসি পাথরের পরিবর্তে পুরোনো ভবন ভাঙা কংকর এবং নিম্নমানের ইট ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের কাজ শুরুর পর থেকেই নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকি দেখা যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগের পর ক্যাম্প বাজারসংলগ্ন চলমান ড্রেনের মাত্র ১০ থেকে ১৫ ফুট অংশ ভেঙে দেওয়া হলেও প্রায় ৩ কিলোমিটারজুড়ে চলমান কাজের সার্বিক মান নিয়ে কোনো দৃশ্যমান কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার প্রকল্পে মাত্র কয়েক ফুট কাজ ভেঙে দেওয়া কি অনিয়মের যথাযথ প্রতিকার, নাকি দায়সারা ব্যবস্থা?
প্রকল্পের কাজ ৬০ শতাংশ, মেয়াদ শেষ
এলজিইডি লামা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সিএইচটি-আরআইডিপি প্রকল্পের আওতায় মো. ইউনুচ অ্যান্ড ব্রাদার্স প্রা. লি. নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা চুক্তিমূল্যে সড়কটির উন্নয়নকাজ দেওয়া হয়েছে।
আজিজনগর ইউনিয়নের ক্যাম্প বাজার থেকে বাছুরিপাড়া হয়ে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্বচাম্বী মুসলিম পাড়া পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কটির প্রথম পর্যায়ে ক্যাম্প বাজার থেকে বাছুরিপাড়া পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার অংশের কাজ চলছে।
২০২৫ সালের জুনে কাজ শুরু হয়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও কাজ শেষ হয়নি। এলজিইডি লামার উপসহকারী প্রকৌশলী সারোয়ার আলম জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
সরেজমিনে সড়কটির বিভিন্ন অংশ ঘুরে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে নির্মাণকাজের মান নিয়ে নানা অভিযোগ পাওয়া যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কের পাশের ড্রেনসহ বিভিন্ন ঢালাইয়ের কাজে বালুর পরিবর্তে পাহাড়ের লাল মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এলসি পাথরের পরিবর্তে পুরোনো বিল্ডিং ভেঙে পাওয়া কংকর ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ইটের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
তাদের দাবি, নির্মাণকাজে ব্যবহৃত এসব উপকরণের মান যথাযথভাবে পরীক্ষা ও যাচাই করা হচ্ছে না। ফলে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত সড়ক ও ড্রেন অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, “ঠিকাদার নিজের ইচ্ছামতো কাজ করে যাচ্ছেন। দেখার কেউ নেই। এলজিইডির প্রতিনিধিরাও সবসময় আসেন না।”
মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম বলেন, “এ ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠা ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।”
মো. শাহজালাল অভিযোগ করে বলেন, “পুরোনো ড্রেনের ঢালাই এবং বিল্ডিং ভাঙা ময়লা কংকর দিয়ে কাজ চলছে।”
আরেক স্থানীয় ব্যক্তি অভিযোগ করেন, কাজটি কমিশনের বিনিময়ে নেওয়া হয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনিয়ম করলেও কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে এ অভিযোগের স্বতন্ত্র কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, “দেশের ক্ষতি ও ভাবমূর্তি নষ্ট করতে আওয়ামী লীগের দরকার হবে না, বিএনপির কিছু লোকজনই যথেষ্ট।”
স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে এলজিইডিকে অবহিত করা হলে ক্যাম্প বাজারসংলগ্ন চলমান ড্রেনের প্রায় ১০ থেকে ১৫ ফুট অংশ ভেঙে দেওয়া হয়।
এ নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি তিন কিলোমিটার সড়কের কাজে যদি নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে শুধু ১০–১৫ ফুট অংশ ভেঙে দিয়ে প্রকল্পের পুরো কাজের মান নিশ্চিত করা সম্ভব কি না।
তাদের দাবি, সড়কের বিভিন্ন অংশ থেকে নির্মাণসামগ্রীর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা, কাজের পরিমাপ যাচাই এবং প্রকল্পের নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এলজিইডি লামার উপসহকারী প্রকৌশলী সারোয়ার আলম বলেন, “অনিয়মের কথা শুনে কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। ঠিকাদার আমাদের কথা শোনেন না। অনিয়ম করায় কিছু অংশের কাজ ভেঙে দেওয়া হয়েছে।”
লামা উপজেলা প্রকৌশলী মো. আবু হানিফ বলেন, “অনিয়মের বিষয়টি জানার পরপরই কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। কাজের মান খারাপ হচ্ছে বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন।”
অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার মো. মেহেদীর বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে এলজিইডি বান্দরবান জেলা কার্যালয়ের প্রকৌশলী প্রতি পদ দেওয়ানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি শুধু একটি সড়ক নির্মাণের বিষয় নয়, এখানে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। তাই নির্মাণকাজে ব্যবহৃত উপকরণের মান, কাজের পরিমাণ, বিল পরিশোধের অগ্রগতি এবং প্রকল্পের প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না, এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
তাদের দাবি, মাত্র কয়েক ফুট কাজ ভেঙে দায় শেষ না করে পুরো তিন কিলোমিটার সড়কের নির্মাণকাজ পরীক্ষা করা হোক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিম্নমানের কাজ পুনরায় সঠিক মানে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হোক।
সম্পাদক ও প্রকাশক : K. Chy