
পরবর্তী পর্বে খাগড়াছড়ি বন বিভাগের দূর্নীতিবাজ রেঞ্জ কর্মকর্তাদের অনিয়ম দূর্নীতির ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
খাগড়াছড়িতে নির্বিচারে বন উজাড় এবং পাহাড় কাটার কারণে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয় অধিবাসী ও পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, একটি অসাধু চক্র বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এই ধ্বংসযজ্ঞ চলছে বছরের পর বছর।
জানা গেছে, খাগড়াছড়িতে নির্বিচারে অশ্রেণিভুক্ত বন উজাড় হচ্ছে বন কর্মকর্তাদের ইন্ধনে। গত কয়েক দশক ধরে ধারাবাহিক বন উজাড়ে প্রতিযোগিতা মেতেছেন খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও রেঞ্জ কর্মকর্তারা। তাদের নির্বিচারে বন নিধনের কারণে একদিকে পাহাড় হারাচ্ছে তার ভারসাম্য, অন্যদিকে ঝুঁকি বাড়ছে জনজীবনে।
জানা গেছে, পার্বত্য অঞ্চলে চার শ্রেণির বন রয়েছে। সেগুলো হলো- সংরক্ষিত বন, ব্যক্তিমালিকাধীন বন, রক্ষিত বন ও অশ্রেণিভুক্ত বন। তবে অধিকাংশই অশ্রেণিভুক্ত বনের আওতাভুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত বন ও অশ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চল উজাড় হচ্ছে বনখেকোদের দৌরাত্ম্যে। এসব বনের কাঠ চলে যাচ্ছে ইটভাটা, করাতকল ও বিভিন্ন তামাকচুল্লিতে। বন কর্মকর্তাদের এভাবে বন নিধন চলতে থাকলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে হারিয়ে যাবে প্রাকৃতিক বন।
খাগড়াছড়িতে সংরক্ষিত বনের পরিমাণ ৬ হাজার ২০০ একর এবং অশ্রেণিভুক্ত বনের আয়তন প্রায় ২ লাখ ৬৩ হাজার ৩২ একর। বন রক্ষায় এখনই প্রশাসন কঠোরভাবে তৎপর না হলে ইটভাটা, তামাকচুল্লি আর করাতকল গিলে খাবে এ বনকে।
খাগড়াছড়িতে অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা ৪৩টি। সবুজ অরণ্যজুড়ে এখন ইটভাটার ক্ষত। সবুজ পাহাড় এবং কৃষিজমিতে জ্বলছে ইটভাটার চিমনি। ভাটার ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য। ভাটা নির্মাণের জন্য পাহাড় কেটে সমান করা হয়েছে। এসব ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে বনের কাঠ।
সূত্র বলছে, প্রতিবছর জেলায় অক্টোবর মাসে ইটভাটাগুলোর কাজ শুরু হয় এবং তা চলে মে থেকে জুন পর্যন্ত। বৃষ্টির আগ পর্যন্ত প্রত্যেকটি ইটভাটায় ১২-১৩ রাউন্ড ইট পোড়ানো হয়। প্রত্যেক রাউন্ডে সাত থেকে আট লাখ ইট পোড়ানো হয়। আর প্রত্যেক ইটভাটায় বছরে গড়ে ১ কোটি ইট উৎপাদন হয়। খাগড়াছড়ির সব ভাটায় বছরে প্রায় ৪৩ কোটি ইট তৈরি হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ থেকে ৩৮৭ কোটি টাকা (প্রতি হাজার গড়ে ৭-৯ হাজার টাকা দরে)।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাতের আঁধারে এবং দিনের বেলাতেও ট্রাকভর্তি কাঠ পাচার করা হচ্ছে। চাপালিশ, গামারি ও চম্পাফুলের মতো মূল্যবান গাছ কেটে পাচার করা হচ্ছে ইটভাটা ও মিলগুলোতে।
জানা গেছে, ইটভাটাতে প্রতি রাউন্ড ইট পোড়াতে প্রায় ৮-৯ হাজার মণ (১ মণে ৪০ সের) জ্বালানি কাঠ লাগে এবং এক মৌসুমে একটি ইটভাটায় গড়ে কাঠ পুড়ে প্রায় ১ লাখ মণ। সেই হিসাবে ৪৩ ইটভাটায় বছরে কমপক্ষে ৪৩ লাখ মণ কাঠ পুড়ছে। ইটভাটা এবং ভাটা শ্রমিকের রান্নাবান্নার কাজসহ প্রায় ৫০ কোটি টাকার গাছ পুড়ছে।
এছাড়া পুরো জেলার আনাচে-কানাচে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে প্রায় দেড় শতাধিক করাতকল। শুরুতে বেশির ভাগই অবৈধ থাকলেও সম্প্রতি অধিকাংশই বৈধতা পেয়েছে। যার বেশির ভাগই রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক দলের প্রভাবশালী নেতাদের মালিকানায়।
বন ও পরিবেশ আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপনের কোনো সুযোগ বা নিয়ম নেই। তবে এসবের তোয়াক্কা করেন না বনখেকোরা। সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘিরেই করাতকল স্থাপন করে দিনে-রাতে কাটা হচ্ছে সংরক্ষিত বনের কাঠ।
করাতকল মিস্ত্রিরা জানান, প্রতিটি করাতকলে দৈনিক অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ ঘনফুট পর্যন্ত কাঠ চিরানো হয়। সে হিসাবে খাগড়াছড়ি জেলার করাতকলগুলোতে প্রাত্যহিক গড়ে অন্তত সাড়ে ২২ হাজার ঘনফুট কাঠ চেরা হয়। বছর শেষে যার পরিমাণ ৮০ লাখ ঘনফুট ছাড়িয়ে যায়।
এ ছাড়া খাগড়াছড়িতে এ বছর ছয় শতাধিক হেক্টর কৃষিজমিতে তামাক চাষ করা হয়েছে। আর এ তামাক পাতা পোড়াতে প্রয়োজন হবে প্রায় চার লাখ মণ কাঠ। যার সবই সংগ্রহ করা হচ্ছে সবুজ বনাঞ্চল ধ্বংস করে।
সাধারণত পার্বত্য অঞ্চলে গাছ কাটতে হলে সরকারিভাবে অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু নজরদারি ও তদারকির অভাবে বিনা অনুমতিতে বনের গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে বনখেকোরা। আর এতে সহযোগিতা করছেন খোদ বনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।
প্রাকৃতিক বন উজাড় করে রাবার ও ফলদ বাগান তৈরি, বনের গাছ চুরির কারণে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক বন। এ ছাড়া অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে বনের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বন ধ্বংসের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে শত প্রজাতির বৃক্ষ, লতা-গুল্ম। বিচরণ ক্ষেত্র কমে যাওয়ায় বনের ওপর নির্ভরশীল বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এসব নিয়ে বন বিভাগের কোনো নজরদারি নেই।
এ বিষয়ে জানার জন্য খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞার সঙ্গে মুঠোফোনে বার বার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
সম্পাদক ও প্রকাশক : K. Chy